রংপুরে সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের আরও তিন সদস্যকে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা তুলে ধরতে গিয়ে সংবাদ সম্মেলনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ। একপর্যায়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি হত্যার নির্মমতার বর্ণনা দেন।
রবিবার (২৩ আগস্ট) দুপুরে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে গ্রেপ্তার দুই সন্দেহভাজনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন তিনি।
পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার দুজন হলেন নগরীর মাছুয়াপাড়ার মুগ্ধ দাস ও তাঁর মামাতো ভাইয়ের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস। সিদ্ধার্থ নগরীর পিকে জুয়েলার্সে কাজ করেন। আর মুগ্ধ সিটি বাজারের একটি মাছের দোকানে কর্মরত।
পুলিশ কমিশনার বলেন, গণপতি স্যার ছিলেন একজন সম্মানিত লোক। তাঁর পরিবারের সঙ্গে কারও কলহ-বিবাদ ছিল না।
এ কথা বলার সময় আবেগ ধরে রাখতে পারেননি তিনি। চোখ মুছতে দেখা যায় পুলিশ কমিশনারকে।
যেভাবে হত্যাকাণ্ড
পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ এক মাদক কারবারির কাছ থেকে ইয়াবা কেনেন। পরে স্থানীয় সীমান্ত নামের এক ব্যক্তির বাসায় গিয়ে তারা ইয়াবা সেবন করেন।
রাতের শেষ দিকে তারা দেবু নামের এক ব্যক্তির নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ থেকে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যান। সেখানে ইয়াবা সেবনের সময় শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী খালি গায়ে ও গলায় গামছা নিয়ে ছাদে বের হন।
পুলিশের দাবি, এ সময় অভিযুক্তরা গামছা পেঁচিয়ে তাঁকে হত্যা করেন। শব্দ শুনে তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ছাদে আসার সময় সিঁড়িতে তাঁকেও হত্যা করা হয়।
এরপর তাঁদের মেয়ে ২৫ বছর বয়সী প্রাপ্তি চক্রবর্তী এগিয়ে এলে তাকেও হত্যা করা হয় বলে জানায় পুলিশ।
প্রাপ্তির হত্যার বর্ণনা দিতে গিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, তাঁর মৃত্যুর জন্য কয়েক মিনিট সময় লেগেছিল বলে জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে। একপর্যায়ে রশি দিয়ে গলা ও মুখ পেঁচিয়ে টান দেওয়ায় তাঁর চোয়াল ভেঙে যায় বলে জানান তিনি।
নিহত চারজনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিল ১২ বছর বয়সী প্রিয়ম চক্রবর্তী। সে রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং গণপতি চক্রবর্তীর ছেলে।
প্রিয়মের হত্যার বর্ণনা দিতে গিয়ে পুরোপুরি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন পুলিশ কমিশনার। কিছুক্ষণ বক্তব্য থামিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “ছোট ছেলেটার কথা বললে আমি আবেগপ্রবণ হয়ে যাই। রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র প্রিয়ম। আমার ছেলের বয়সী।”
পুলিশ কমিশনার জানান, প্রিয়মকে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। পরে বালিশ চাপা দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
হত্যার পরও বাড়িতে অবস্থান
পুলিশের দাবি, চারজনকে হত্যার পরও অভিযুক্তরা ওই বাড়িতেই অবস্থান করেন। সকাল হলে তারা নিহত প্রিয়মের বাথরুমে গোসল করেন। এরপর বাড়ির ডাইনিং টেবিলে থাকা বৈয়াম থেকে খেজুর ও শসা খান।
পুলিশ কমিশনার আরও জানান, এরপর অভিযুক্তরা ওই বাড়িতেই বসে আবার ইয়াবা সেবন করেন।
হত্যার পর আলামত নষ্টের চেষ্টাও করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। নিহতদের ব্যবহৃত দুটি স্মার্টফোন ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে চুবিয়ে রেখে সেগুলো থেকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয় বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে।
দ্রুত চার্জশিট দেওয়ার আশ্বাস
পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ বলেন, খুব অল্প সময়ের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে।
তিনি বলেন, দ্রুত তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়া হবে। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্য কেউ থাকলে তাকেও আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দেন তিনি।
একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় রংপুরজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ঘটনার সব দিক তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।