রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও ১২ বছরের ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
রবিবার (২৩ আগস্ট) দুপুরে রংপুর মহানগর পুলিশের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ এসব তথ্য জানান।
গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস মাছুয়াপাড়া এলাকার কানুদাসের ছেলে এবং সিদ্ধার্থ দাস বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে। পুলিশ জানিয়েছে, সিদ্ধার্থ একটি জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে এবং মুগ্ধ একটি মাছের দোকানে কাজ করেন। তাঁরা পরস্পর আত্মীয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী পার্থী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়ম (১২)।
পুলিশ কমিশনার জানান, বৃহস্পতিবার রাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ ইয়াবা কিনে প্রথমে স্থানীয় এক ব্যক্তির বাসায় সেবন করেন। পরে রাতের শেষ দিকে পাশের একটি নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে প্রবেশ করেন তাঁরা। সেখানে বসে ইয়াবা সেবনের সময় শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গিয়ে তাঁদের সেখানে থাকার কারণ জানতে চান।
এ সময় পরিচয় গোপন রাখতে তাঁকে গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। তাঁর চিৎকার শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠলে তাঁকেও একইভাবে হত্যা করা হয়।
পরে মায়ের চিৎকার শুনে মেয়ে পার্থী সেখানে গেলে তাঁকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পুলিশ জানায়, পার্থীকে হত্যা করতে কয়েক মিনিট সময় লাগে। মৃত্যু নিশ্চিত করতে তাঁর গলায় ও শরীরে রশি পেঁচিয়ে টানা হয়। সর্বশেষ ঘুমন্ত শিশু প্রিয়মকে কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের ভাষ্য।
হত্যাকাণ্ডের পরও বাড়িতেই কিছু সময় অবস্থান করেন অভিযুক্তরা। পুলিশ জানায়, তাঁরা বাড়ির বাথরুমে গোসল করেন এবং ডাইনিং টেবিলে থাকা খেজুর ও শসা খান। পরে অবশিষ্ট ইয়াবা সেবন করেন।
পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখাতে ঘরের বিভিন্ন আসবাব ও জিনিসপত্র ইচ্ছাকৃতভাবে এলোমেলো করে রাখা হয়। দুটি মোবাইল ফোনের সম্ভাব্য ফিঙ্গারপ্রিন্ট মুছে ফেলতে সেগুলো ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল বলেও জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া বাড়িতে থাকা স্বর্ণালংকার পরীক্ষা করতে আগুন জ্বালানো হয়। পরে সেগুলো নিয়ে শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট তুলনামূলক ফাঁকা থাকার সুযোগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান অভিযুক্তরা। স্বর্ণালংকারগুলো একটি মন্দিরের পেছনের পরিত্যক্ত স্থানে লুকিয়ে রাখেন তাঁরা। পরে তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সেগুলো উদ্ধার করেছে পুলিশ।
এর আগে শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে মাছুয়াপাড়ার ওই বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দুই দিন ধরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে স্বজনেরা বাড়িতে গিয়ে মূল ফটকে তালা দেখতে পান। পরে বাড়ির ভেতরে ঢুকে চারজনের মরদেহ দেখতে পান তাঁরা।
গণপতি চক্রবর্তী গত ডিসেম্বরে রংপুর জিলা স্কুল থেকে অবসর নেন। অবসরের পর তিনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাসেবা দিতেন।
ঘটনার শুরুতে বাড়ির পরিস্থিতি দেখে পুলিশ এটিকে ডাকাতির ঘটনা বলে ধারণা করেছিল। তবে নিহতদের স্বজনেরা শুরু থেকেই এটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করে আসছিলেন। বাড়ি নির্মাণের সময় চাঁদার টাকা নিয়ে বিরোধের বিষয়টিও তাঁরা পুলিশের কাছে তুলে ধরেন।
তবে গ্রেপ্তারের পর পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার।
এ ঘটনায় রংপুর মহানগরীর কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা হয়েছে। দ্রুত তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়ার চেষ্টা করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।