দেশে ভয়াবহ জ্বালানি সংকট ক্রমেই দীর্ঘায়িত হচ্ছে। গ্যাসের ঘাটতি, এলএনজি সরবরাহে একের পর এক বিপর্যয়, জ্বালানি তেল আমদানিতে অনিশ্চয়তা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি সংকটের কারণে চাপে পড়েছে শিল্প, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও সাধারণ মানুষের জীবন। এতে জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে সরকার। বহু শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে গেছে, কোথাও কোথাও বন্ধ রাখতে হচ্ছে কারখানা। সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন, বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে বাড়ছে জনদুর্ভোগ। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে শিল্প ও রপ্তানি খাতে। গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চিত সরবরাহে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন উদ্যোক্তারা।
পেট্রোবাংলার হিসাবে, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিন ঘাটতি প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় এই ঘাটতি পূরণে ক্রমেই বাড়ছে এলএনজি আমদানিনির্ভরতা। এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্পট মার্কেট থেকে কয়েক গুণ বেশি দামে কার্গো কিনতে হয়েছে। বছরের শুরুতে প্রায় ১০ ডলার দরে স্পট এলএনজি কেনা হলেও মার্চে দুটি কার্গোর দাম উঠে যায় যথাক্রমে ২৮ দশমিক ২৮ ও ২৩ দশমিক ৮ ডলারে।
সংকটের বড় ধাক্কা আসে জুলাইয়ের শেষ দিকে। এক্সিলারেট এনার্জির মহেশখালী এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও বৈদ্যুতিক কেবল-সংক্রান্ত সমস্যার পর টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যায়। এতে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। আগস্টে সামিট ও এক্সিলারেট Ñদুই টার্মিনালেই নতুন সমস্যা দেখা দিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ১৪ আগস্ট একপর্যায়ে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে যায়। পরে সামিট ও এক্সিলারেট আংশিকভাবে সরবরাহে ফিরলেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি।
গ্যাসের ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিকল্প হিসেবে কয়লা ও তরল জ্বালানিভিত্তিক কেন্দ্র চালাতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। এরই মধ্যে জুনে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় দাম ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়িয়ে প্রতি ইউনিট ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা করা হয়েছে। শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় রপ্তানি বাজারেও বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমছে।
সংকট সামাল দিতে সরকার জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি ও জ্বালানি তেল আমদানি, সরবরাহ রেশনিং এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, চাইলেও এক মাসের মধ্যে জ্বালানি সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে এবং ন্যূনতম তিন মাসের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে বঙ্গোপসাগরে ২৬টি তেল-গ্যাস ব্লকে অনুসন্ধান, ২০২৯ সালের মধ্যে আরও তিনটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো না গেলে বর্তমান সংকট আরও দীর্ঘ হতে পারে। আর তা হলে এর চাপ শুধু বিদ্যুৎ ও শিল্পে নয়, রপ্তানি, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসহ পুরো অর্থনীতির ওপর পড়বে।