রাতের নীরবতা ভেঙে হঠাৎ কয়েকটি গুলির শব্দ। মুহূর্তেই ছুটোছুটি শুরু। কেউ নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছেন, কেউ দরজা-জানালা বন্ধ করছেন। কোথাও গুলির পর পড়ে থাকছে রক্তাক্ত শরীর, কোথাও আতঙ্কে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দোকানপাট। একসময় গুলির শব্দ মানেই ছিল বড় কোনো সন্ত্রাসী হামলা, রাজনৈতিক সংঘাত কিংবা দুর্ধর্ষ অপরাধ। এখন সেই হিসাব বদলে যাচ্ছে। তুচ্ছ বিরোধ, আধিপত্যের লড়াই, মাদক ও চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, ছিনতাই কিংবা প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাতেও প্রকাশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্র।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রতিক একের পর এক ঘটনা বলছে, বন্দুক আর অপরাধীর গোপন অস্ত্র হয়ে নেই; জনপদের প্রকাশ্য আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। রাজধানীর বাইরে খুলনা, নোয়াখালী, সুনামগঞ্জ, ফরিদপুর, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় গুলি চালানো, অস্ত্র প্রদর্শন কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা সেই উদ্বেগই বাড়াচ্ছে। সূত্র অনুযায়ী, চলতি বছরের সাড়ে সাত মাসে দেশে ১২৩টি গুলির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৫৯ জন।
সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি খুলনায়। গত ১৯ আগস্ট নগরীর লবণচরা থানার আশিবিঘা এলাকায় কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুই তরুণকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই এলাকায় পরপর দুটি হত্যাকাণ্ড স্থানীয় মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক অনুসন্ধানে স্থানীয় অপরাধীচক্র, আধিপত্য বিস্তার ও পুরোনো বিরোধের বিষয়গুলো সামনে এসেছে।
এর আগে ১৭ আগস্ট নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে গায়েহলুদের অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে ছররা গুলিতে আহত হন পাঁচ যুবক। আলাইয়াপুর ইউনিয়নের মোশাকপুর গ্রামের গাজীটোলা এলাকায় রাত সোয়া ১১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। তারও আগে গত ৯ জুনও বেগমগঞ্জে প্রকাশ্যে এক যুবককে গুলি করার অভিযোগ ওঠে। এদিকে আগস্টের শুরুতে সাবেক এক যুবদল নেতাকে বাড়িতে ঢুকে গুলি করার অভিযোগ ঘিরেও রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেখা যায়। অর্থাৎ একই এলাকায় বিচ্ছিন্ন বলে মনে হওয়া একাধিক ঘটনায় আগ্নেয়াস্ত্রের উপস্থিতি এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
এদিকে সর্বশেষ গত ২১ আগস্ট সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে জুমার নামাজ পড়তে যাওয়ার পথে গুলিবিদ্ধ হন আবুল হেকিম ও মিফতা মিয়া। স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, শাহারপাড়া-নারায়ণপুর চাইল্লাবন্দে এলাকায় মসজিদের পথে তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। গুরুতর আহত দুজনকে পরে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
অস্ত্রের ব্যবহার শুধু হত্যাকাণ্ডেই সীমাবদ্ধ নেই। ফরিদপুরের ভাঙ্গায় গাড়ি পার্কিং নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে এক যুবক পিস্তল বের করে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়েন। ঘটনাটি ঘটে হাইওয়ে থানার সামনেই। পরে এর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্থাপনার কাছাকাছি এলাকাতেও প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন ও গুলি ছোড়ার সাহস দেখাচ্ছে অপরাধীরা।
লুট হওয়া অস্ত্রের ঝুঁকি : অবৈধ অস্ত্রের বিস্তারের সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন থানা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্থাপনা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় দেশের বিভিন্ন পুলিশ স্থাপনা থেকে ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮টি গোলাবারুদ লুট হয়। ২০২৬ সালের ৫ জুলাই পর্যন্ত যৌথ অভিযানে ৪ হাজার ৪৪৫টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা গেলেও ১ হাজার ৩১৮টি অস্ত্র এবং ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৩৯টি গোলাবারুদের হদিস মেলেনি।
এই বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদের কতটা অপরাধীদের হাতে গেছে, কতটা সীমান্তপথে পাচার হয়েছে কিংবা কোথাও গোপনে মজুত রয়েছে, তার পুরো চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়। তবে চট্টগ্রামের কয়েকটি ঘটনায় উদ্বেগের কারণ মিলেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নগরের আট থানাসহ পুলিশের ২৯টি স্থাপনা থেকে ৯৪৪টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৮৬ হাজার ৪৭৮ রাউন্ড গোলাবারুদ লুট হয়েছিল। পরে ৭৯৬টি অস্ত্র উদ্ধার হলেও ১৪৮টির এখনো সন্ধান মেলেনি। উদ্ধার হওয়া কিছু অস্ত্র অপরাধীদের কাছ থেকে পাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
খুলনায় সক্রিয় অপরাধীচক্র : খুলনার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোও পরিস্থিতির ভয়াবহতা সামনে এনেছে। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মহানগর ও জেলায় একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয়। কোনোটি মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা ঘিরে, কোনোটি জমি, ঘের, ঘাট, পরিবহন কিংবা ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে। এসব চক্রের সঙ্গে শুটার, মোটরসাইকেল বাহিনী, মাদক বিক্রেতা, কিশোর গ্যাং ও তথ্যদাতাদের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও হয়ে উঠেছে শক্তি প্রদর্শনের নতুন মঞ্চ। অস্ত্র হাতে ছবি ও ভিডিও প্রকাশ, প্রতিপক্ষকে হত্যার হুমকি কিংবা নিজেদের আধিপত্যের প্রচারণা, এসবের মাধ্যমে অপরাধীরা শুধু ভয় দেখাচ্ছে না, বরং জনমনে নিজেদের প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
ছদ্মবেশেও অপরাধ : অপরাধের ধরনও বদলেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের অভিযোগে রাজধানীতে একটি চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তারের সময় লোগোযুক্ত পোশাক, ভুয়া পরিচয়পত্রের খাপ, ওয়াকিটকি, হাতকড়া, ভুয়া নম্বর প্লেট ও পিস্তলের খাপ উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে সাবেক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যও ছিলেন বলে জানা যায়। এ ধরনের ঘটনায় সাধারণ মানুষের ঝুঁকি দ্বিগুণ। কারণ প্রকৃত ও ছদ্মবেশী সদস্যের পার্থক্য বোঝা কঠিন হলে অপরাধীরা সহজেই মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটিত হলে মানুষের আস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
কেন বাড়ছে বন্দুকের দাপট? অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা, অস্ত্রের বাজার, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, স্থানীয় আধিপত্যের দ্বন্দ্ব এবং অপরাধীচক্রের বিস্তার, সব মিলেই পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রবণতা এবং প্রতিশোধের সংস্কৃতি। অনেক ক্ষেত্রে মামলা হলেও মূল পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা বা পৃষ্ঠপোষকেরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাওয়ায় একই চক্র নতুন করে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদরদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) ভোরের ডাক’কে বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চলছে। নিয়মিতভাবেই অস্ত্র-গুলিসহ অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তবে নিখোঁজ অস্ত্র ও গোলাবারুদের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার না হওয়ায় ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ, মানুষের কাছে গুলির শব্দ ধীরে ধীরে যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। বিরোধ মেটাতে সংলাপের বদলে অস্ত্র, আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সামাজিক শক্তির বদলে বন্দুক এবং ভয় দেখাতে কথার বদলে গুলি, এ প্রবণতা কোনো সুস্থ সমাজের চিত্র হতে পারে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাই প্রয়োজন শুধু গুলি চলার পর অভিযান নয়; অস্ত্রের উৎস থেকে ব্যবহারকারী পর্যন্ত পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা।
তাদের দাবি, ২০২৪ সালের অস্থির সময়ে লুট হওয়া অবশিষ্ট অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে বিশেষ অভিযান জোরদার করার পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্রের সরবরাহকারী, মজুতদার ও পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কারণ আজ যে গুলি ছোড়া হচ্ছে ‘ফাঁকা’ বলে, সেটিই কাল কারও প্রাণ কেড়ে নিতে পারে। বিচ্ছিন্ন ঘটনার আড়ালে বন্দুকের যে বিস্তার তৈরি হচ্ছে, এখনই তা থামাতে না পারলে জনপদের নিরাপত্তা আরও গভীর সংকটে পড়বে।