বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে বন অপরাধ দমনে নিয়মিত অভিযান চালিয়েও চোরা শিকারিদের দৌরাত্ম্য পুরোপুরি ঠেকানো যাচ্ছে না। হরিণ শিকার, বিষ দিয়ে মাছ ধরা, অবৈধভাবে বনে প্রবেশসহ নানা অপরাধে চলতি বছরের জুন ও জুলাই মাসে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে ১০৮টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৪৬ জনকে আটক করা হয়েছে এবং দায়ের হয়েছে ৮৯টি মামলা।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দুই মাসের অভিযানে ৩০ কেজি হরিণের মাংস ও প্রায় দেড় হাজার মিটার হরিণ ধরার মালা ফাঁদ জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ মাছ, কাঁকড়া, জাল, বিষ ও অবৈধভাবে ব্যবহৃত নৌযানও উদ্ধার করা হয়।
জুন ও জুলাই মাসে সুন্দরবনে অবৈধভাবে প্রবেশ, অনুমোদন ছাড়া মাছ ধরা, বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার এবং বন্যপ্রাণী হত্যার অভিযোগে এসব মামলা ও আটকের ঘটনা ঘটে।
বন বিভাগ জানায়, ৮৯টি মামলার মধ্যে পি ও আর মামলা ১৯টি, ইউ ডি ও আর মামলা ৬৯টি এবং সি ও আর মামলা একটি।
অভিযানকালে ৮৯টি নৌকা ও তিনটি ট্রলার জব্দ করা হয়। এছাড়া ৫৩টি মাছ ধরার জাল, ৪৭ বোতল বিষ, ১ হাজার ২০০ কেজি কাঁকড়া, ৬১০ কেজি চিংড়ি এবং ১৮৫ কেজি সাদা মাছ জব্দ করা হয়েছে।
বন বিভাগের অভিযানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে হরিণ শিকারের ক্ষেত্রে। দুই মাসে প্রায় দেড় হাজার মিটার মালা ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ফাঁদ পেতে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় হরিণ শিকার করা হয়।
এ সময় শিকার করা হরিণের ৩০ কেজি মাংসও জব্দ করেছে বন বিভাগ। এতে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
২০২৫ সালের জুন ও জুলাই মাসে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে ১১০টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। ওই সময়ে ৪৭ জনকে আটক এবং ৮২টি মামলা করা হয়। এর মধ্যে পি ও আর মামলা ছিল ১৯টি এবং ইউ ডি ও আর মামলা ৬৩টি।
গত বছরের একই সময়ে ৯৭টি নৌকা ও চারটি ট্রলার, ৭১টি মাছ ধরার জাল এবং ৪৪ বোতল বিষ জব্দ করা হয়েছিল। এছাড়া ২ হাজার ২০০ কেজি কাঁকড়া, ৯৯৩ কেজি শুঁটকি, ৭৪০ কেজি চিংড়ি, ২১০ কেজি সাদা মাছ ও ৩২ কেজি হরিণের মাংস উদ্ধার করা হয়। হরিণ শিকারের প্রায় এক হাজার মিটার মালা ফাঁদও জব্দ হয়েছিল।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন-জুলাইয়ে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অভিযান দুটি এবং আটক একজন কমেছে। তবে মামলা সাতটি বেড়েছে। একই সঙ্গে হরিণের মাংস উদ্ধারের পরিমাণ কিছুটা কমলেও মালা ফাঁদ উদ্ধারের পরিমাণ বেড়েছে।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এজেডএম হাছানুর রহমান বলেন, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের জুন ও জুলাইয়ে পশ্চিম সুন্দরবনে বন অপরাধ কিছুটা কমেছে।
তিনি বলেন, সুন্দরবনে অবৈধ প্রবেশ, অনুমোদনহীনভাবে মাছ ধরা এবং বন্যপ্রাণী শিকার বন্ধে বনরক্ষীরা নিয়মিত টহল ও অভিযান পরিচালনা করছেন। নিয়মিত নজরদারি ও আইন প্রয়োগের ফলে বন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে।
পরিবেশবিদ ও বনপ্রেমীরা বলছেন, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় শুধু অভিযান নয়, অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে হরিণ শিকারের মালা ফাঁদ, বিষ দিয়ে মাছ ধরা এবং অবৈধভাবে বনে প্রবেশ বন্ধে নজরদারি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। এতে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।