নদীভাঙন থেকে রক্ষার আশ্বাস মিলেছিল একাধিক দপ্তর থেকে। কিন্তু কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়ার আগেই গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চরাঞ্চলের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীভাঙনের কবলে পড়েছে। ইতোমধ্যে বিদ্যালয়ের একটি বেড়া ও তিনটি জানালা নদীতে বিলীন হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় বিদ্যালয়ের আসবাবপত্র অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এ ঘটনায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়টি রক্ষায় পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী, উপজেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে ভাঙন ঠেকাতে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
স্থানীয়রা জানান, গত ৮ আগস্ট পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে বিদ্যালয়টি রক্ষার আশ্বাস দেন। এর আগেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা এলাকা পরিদর্শন করেছিলেন। তবে পরিদর্শনের পরও নদীভাঙন ঠেকাতে দৃশ্যমান কোনো কাজ শুরু হয়নি।
কাপাসিয়া ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক মো. জামাল উদ্দিন বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বিশেষ করে চরবাসীর একমাত্র বিদ্যালয়টি রক্ষার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সময়মতো উদ্যোগ না নেওয়ায় এখন স্কুলটি সরিয়ে নিতে হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছাইফুল ইসলাম বলেন, গতকালও বিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস হয়েছে। আজ ভোরে ভাঙনের খবর পাওয়ার পর সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানানো হয়। তাঁর পরামর্শে ১৪ জন শ্রমিক দিয়ে বিদ্যালয়ের আসবাবপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে বিদ্যালয়ের একটি বেড়া ও তিনটি জানালা নদীতে বিলীন হয়েছে।
উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুকুল চন্দ্র বলেন, নদীভাঙন শুরুর পর থেকেই বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, নতুন করে ভাঙন শুরু হয়েছে। এ কারণে বিদ্যালয়টি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জলাবদ্ধতায় আমন চাষেও অনিশ্চয়তা
এদিকে নদীভাঙনের পাশাপাশি গাইবান্ধা সদর উপজেলার বোয়ালী ও রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতার কারণে আমন চাষ নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এতে পাঁচ শতাধিক কৃষক বিপাকে পড়েছেন।
কৃষকদের ভাষ্য, ১৫ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত আমন রোপণের উপযুক্ত সময় পার হয়ে গেলেও অতিরিক্ত পানির কারণে অনেক জমিতে এখনো চারা রোপণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে চলতি মৌসুমে অনেক জমি অনাবাদি পড়ে থাকার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
রাধাকৃষ্ণপুর, ভেলাকোপা ও পাকড়িছিড়া ব্রিজের উত্তর-দক্ষিণ এলাকার বিভিন্ন মাঠে দীর্ঘদিন ধরে পানি জমে রয়েছে। কোথাও কোমরসমান, কোথাও হাঁটুর ওপর পানি। অনেক জমি আবার কচুরিপানায় ঢেকে গেছে। অথচ আশপাশের গরদিঘি, রহমতপুর, গোপালপুর, ত্রিমোহিনী, বাদিয়াখালী ও পেয়ারাপুর এলাকায় অধিকাংশ জমিতে আমন রোপণ শেষ হয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, কাদের মিয়ার বাড়ি থেকে ভেলাকোপা হয়ে পূর্ব হরিপুর পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় পানি নিষ্কাশনের কোনো কার্যকর নালা নেই। প্রায় তিন দশক আগে বন্যার পর পুরোনো নালাটি ভরাট হয়ে যায়। পরে সংস্কারের অভাবে সেটি অচল হয়ে পড়ে। বিভিন্ন স্থানে নালার অংশ ভরাট হওয়ায় পানি নিষ্কাশন আরও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এ ছাড়া পানি চলাচলের পথে এসকেএস ফাউন্ডেশনের ভবন ও প্রাচীর নির্মাণ এবং অপর্যাপ্ত পাইপ ব্যবহারের কারণেও পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা।
জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা জানান, প্রতিবছর বীজতলা নষ্ট, চারা পুনরায় রোপণ ও ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাড়তি খরচ করতে হয়। গত বছরও অনেক কৃষক দুই দফা চারা রোপণ করেও কাঙ্ক্ষিত ফলন পাননি। আমনের পাশাপাশি ইরি ধানও কখনো কখনো জলাবদ্ধতার কারণে নষ্ট হয়।
কৃষকদের দাবি, দুই পাশের বিদ্যমান নালার সঙ্গে সংযোগ রেখে মাঝের প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় নতুন নালা খনন করা হলে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব। এতে আমন, ইরি ও বর্ষালী তিন মৌসুমেই চাষাবাদ করা যাবে।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা উম্মে কুলসুম বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে ওই এলাকায় খাল খনন জরুরি। ১৫ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট আমন রোপণের উৎকৃষ্ট সময়। দেশি জাতের ধান আরও প্রায় ১৫ দিন রোপণ করা গেলেও এরপর ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বোয়ালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম সাবু বলেন, কৃষকদের দুর্ভোগের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবুজ কুমার বসাক বলেন, তিনি নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন এবং কৃষকদের সমস্যাটি গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন।
একদিকে নদীভাঙনে চরবাসীর একমাত্র বিদ্যালয় সরিয়ে নিতে হচ্ছে, অন্যদিকে জলাবদ্ধতায় কৃষকদের আমন চাষ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে শিক্ষা ও কৃষি দুই ক্ষেত্রেই স্থানীয়দের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।