খুলনা মহানগরীতে দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা ভবনগুলো অপসারণে সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রম ধীরগতির অভিযোগ উঠেছে। বছরের পর বছর জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকা এসব ভবন বর্ষা মৌসুমে আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন ভবনের ছাদ ও দেয়ালের অংশ খুলে পড়ার পাশাপাশি কোথাও কোথাও ফাটল দেখা দিয়েছে। ফলে যেকোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) একটি কমিটি মহানগরীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে সেগুলো অপসারণের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি। পরে যাচাই-বাছাই শেষে ২০২৫ সালে ঝুঁকিপূর্ণ ও বসবাসের অনুপযোগী ৪৮টি ভবনের ছাদ ভেঙে অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও সেটিও কার্যকর হয়নি।
নগরীর বড়বাজার এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা বেশি বলে জানা গেছে। এসব ভবনের অনেকগুলো দ্বিতল ও তিনতলা। ওপরের অংশে পরিবার নিয়ে মানুষ বসবাস করছেন, দ্বিতীয় তলায় রয়েছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও গোডাউন এবং নিচতলায় চলছে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা। ফলে কোনো ভবন ধসে পড়লে বড় ধরনের প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এর আগে ২০০৮ সালে বড়বাজার এলাকায় ভবন ধসে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছিল।
নগরীর প্রাণকেন্দ্র ডাকবাংলা এলাকার লোয়ার যশোর রোডের ৮৩ নম্বর হোল্ডিংয়ের মৃত নুরনদ্দিন সরদারের পুরোনো বাড়িটিও দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ভবনটির ছাদ ও বিভিন্ন অংশ থেকে পলেস্তারা ও নির্মাণসামগ্রী খুলে পড়ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, যেকোনো সময় ভবনটির কোনো অংশ ধসে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
কেসিসি সূত্র জানায়, সরেজমিন পরিদর্শনের পর ২০২৩ সালের ১১ এপ্রিল কেসিসি, ফায়ার সার্ভিস, গণপূর্ত অধিদপ্তর, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ) ও খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) এই পাঁচ সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত উপকমিটির সদস্যরা ভবনটিকে বসবাসের অনুপযোগী ঘোষণা করেন।
এরপর ২০২৩ সালের ২১ আগস্ট ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ও বসবাসের জন্য অনিরাপদ উল্লেখ করে কেসিসির পক্ষ থেকে সাইনবোর্ড টানানো হয়। একই সঙ্গে ভবনটি অপসারণের জন্য মালিকপক্ষের কয়েকজন সদস্য কেসিসিতে আবেদন করেন।
কিন্তু এরপরও ভবনটি অপসারণ করা হয়নি। ২০২৪ সালের ৩০ মে ভবনের একটি অংশ ধসে পড়ার পর ৫ জুন কেসিসি ৩৭৭ নম্বর স্মারকে আবারও অপসারণের নোটিশ দেয়। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সও ভবনটি দ্রুত অপসারণের জন্য কেসিসিকে চিঠি দেয়। পরে ১০ ডিসেম্বর আবারও চিঠি দেওয়া হয়। তবু কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
সর্বশেষ ২০২৬ সালের ২৩ জুন মৃত ইমদাদুল হকের মেয়ে সায়মা হক ভবনটি অপসারণের জন্য কেসিসিতে আবেদন করেন। এরপরও এখন পর্যন্ত ভবন অপসারণে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে কেসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাজিব আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
কেসিসির প্রধান প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার মশিউজ্জামান খান বলেন, মহানগরীর ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিত্যক্ত ভবনগুলোর বিষয়ে খুব দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নগরবাসীর অভিযোগ, কোনো ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পরও বছরের পর বছর সেটি অপসারণ না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় এসব ভবনের নিচে দোকান, গোডাউন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থাকায় ঝুঁকি বহুগুণ বেড়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা দ্রুত হালনাগাদ করে নিয়মিত পরিদর্শন, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক। তা না হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।