চাঁদাবাজি যেন আবারও নগরজীবনের নিত্যদিনের অদৃশ্য আতঙ্ক হয়ে উঠছে। ফুটপাত, বাজার, পরিবহন, নির্মাণকাজ, বালু-পাথর, ভাঙারি, ঝুট ব্যবসা কিংবা আবাসিক এলাকার নানা কর্মকান্ড, যেখানেই অর্থের প্রবাহ, সেখানেই তৈরি হচ্ছে চাঁদা আদায়ের নতুন নতুন ‘স্পট’। কোথাও স্থানীয় প্রভাব, কোথাও রাজনৈতিক পরিচয়, আবার কোথাও সন্ত্রাসী চক্রের ভয় দেখিয়ে আদায় করা হচ্ছে টাকা। কিন্তু এই অবৈধ অর্থের ভাগ কার হাতে কত যাবে, তা নিয়েই এখন বাড়ছে সংঘাত। আর সেই সংঘাতের পরিণতি কখনো মারধর, কখনো হামলা, কখনো ধারালো অস্ত্রের আঘাত, শেষ পর্যন্ত হত্যাকান্ড।
পুরান ঢাকার সদরঘাটে সাম্প্রতিক হত্যাকান্ড সেই ভয়াবহ বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। গত ১৫ আগস্ট রাতে সূত্রাপুর থানার ইস্ট বেঙ্গল সুপার মার্কেটে চাঁদাবাজির টাকা ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে মিতুল নামে এক যুবক নিহত হন। সূত্র বলছে, সংঘর্ষে আরও একজন আহত হন। নিহত মিতুল কোতোয়ালি থানার ৩৭ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য ছিলেন বলে জানা গেছে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, চাঁদার টাকা কে কত ভাগ পাবেন, তা নিয়েই বিরোধের সূত্রপাত। একপর্যায়ে উত্তেজনা সংঘর্ষে রূপ নেয়। অভিযোগ রয়েছে, মিতুলকে কাপড় কাটার কাঁচি দিয়ে বুকে আঘাত করা হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
একটি চাঁদার স্পট থেকে ওঠা টাকার ভাগ নিয়ে এমন রক্তপাত শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধের ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে রয়েছে নগরজুড়ে গড়ে ওঠা অবৈধ অর্থনীতির একটি কাঠামো, যেখানে একটি স্পটের নিয়ন্ত্রণ মানেই নিয়মিত অর্থপ্রবাহের নিয়ন্ত্রণ। ফলে সেই নিয়ন্ত্রণ হারানো বা নতুন পক্ষের প্রবেশ অনেক সময়ই আধিপত্যের সংঘাতে রূপ নেয়।
চাঁদার ‘স্পট’ কত? রাজধানীতে চাঁদাবাজির বিস্তার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তালিকা ও সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। চলতি বছরের মে মাসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, মিরপুর অঞ্চলের সাতটি থানায় চাঁদাবাজির দেড় শতাধিক স্পট রয়েছে। এসব স্থানে চাঁদা তোলার সঙ্গে ৭২ জনের সম্পৃক্ততার তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তালিকায় ছিল। তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা হিসেবে আরও ২৫ জনের নাম থাকার কথাও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
চাঁদাবাজির ক্ষেত্রও এখন বিস্তৃত। গাবতলী টার্মিনাল, ফুটপাত, অবৈধ পার্কিং, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার গ্যারেজ, লেগুনাস্ট্যান্ড, ভাঙারির দোকান, ইন্টারনেট ব্যবসা, ময়লার ব্যবসা, পোশাক কারখানা, ঝুট, নির্মাণকাজ, বালু-পাথর ও বস্তি, বিভিন্ন খাতে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ চাঁদাবাজি এখন আর শুধু বাজার বা পরিবহনেেরর অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের প্রায় প্রতিটি স্তরেই এর ছায়া পড়ছে।
টাকা যত বড়, সংঘাতও তত ভয়ংকর : একটি চাঁদার স্পটকে ঘিরে একাধিক পক্ষের স্বার্থ তৈরি হলে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ে। দীর্ঘদিন ধরে কোনো একটি পক্ষ টাকা তুলে এলে সেখানে নতুন পক্ষের প্রবেশকে তারা সহজে মেনে নিতে চায় না। অন্যদিকে নতুন পক্ষও নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। শুরু হয় আধিপত্যের লড়াই। প্রথমে কথাকাটাকাটি। এরপর ধাক্কাধাক্কি। তারপর লাঠি, রড, ককটেল কিংবা ধারালো অস্ত্র। শেষ পর্যন্ত সেই সংঘাতের পরিণতি হতে পারে হত্যাকান্ড। সদরঘাটের ঘটনা তারই একটি দৃষ্টান্ত। চাঁদার টাকা ভাগাভাগির বিরোধ থেকে একজনের প্রাণ গেল। যে অর্থের জন্য সংঘাত, সেই অর্থের পরিমাণ হয়তো কয়েকজনের কাছে সাময়িক লাভের বিষয়; কিন্তু তার মূল্য দিতে হয় একটি পরিবারকে, একটি সমাজকে। এর আগে রাজধানীর আদাবরেও চাঁদাবাজির অভিযোগে গণপিটুনির শিকার এক ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনা আলোচনায় আসে। সুনিবিড় হাউজিংয়ের একটি গলিতে চাঁদাবাজির অভিযোগে গণপিটুনির কয়েক ঘণ্টা পর তার মৃত্যু হয় বলে জানা গেছে।
চাঁদা না দিলে হামলা : চাঁদাবাজির আরেকটি চিত্র হলো, টাকা না দিলে ভয় দেখানো, হামলা, ভাঙচুর কিংবা ককটেল বিস্ফোরণ। চট্টগ্রামে গত জুলাইয়ে এক স্থানীয় ব্যবসায়ীর কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে। চাঁদা না দেওয়ায় নির্মাণাধীন ভবনে ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগও সামনে আসে। এ ধরনের ঘটনায় আতঙ্ক শুধু ব্যবসায়ীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তার কর্মচারী, পরিবারের সদস্য এমনকি আশপাশের ব্যবসায়ীরাও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। অনেক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেও পরে হামলা বা হয়রানির আশঙ্কায় প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। ফলে অনেক ঘটনা মামলা পর্যন্ত গড়ায় না। আর অভিযোগ না হওয়া, তদন্ত না হওয়া কিংবা বিচার দৃশ্যমান না হওয়া অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে।
রাজনৈতিক পরিচয় কি ঢাল? : চাঁদাবাজির সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন এলাকার স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের নামও অভিযোগ কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তালিকায় এসেছে। তবে কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হলেই কেউ অপরাধী, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার।
সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন কোনো অপরাধী রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয়কে নিজের প্রভাব বিস্তারের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। এতে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করতে ভয় পান, আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরও তৈরি হয় বাড়তি চাপ।
মিরপুরে চাঁদাবাজির বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতা-কর্মীদের নাম থাকার কথা উঠে এসেছিল। একই সময়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, চাঁদাবাজির সঙ্গে কোনো পুলিশ সদস্যের সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশও যখন অভিযোগের কেন্দ্রে : চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব যাদের, তাদের কেউ অভিযোগের কেন্দ্রে চলে এলে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে। সর্বশেষ গত ১৭ আগস্ট সাভার মডেল থানার এক উপপরিদর্শকসহ তিনজনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগে আদালতে মামলা করার আবেদন এবং তদন্তের নির্দেশের খবর প্রকাশিত হয়েছে। অভিযোগটির সত্যতা এখনো তদন্তাধীন; তাই এর দায় বা অপরাধ নির্ধারণের আগে বিচারিক প্রক্রিয়ার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করাই স্বাভাবিক। তবে ঘটনাটি একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্বে থাকা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধেই যদি চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে, তাহলে ভুক্তভোগী কোথায় যাবেন? এ কারণেই অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ-অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা যায়। কিন্তু এতে সমস্যার মূল শিকড় উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়। তার মতে, যদি অর্থের নেটওয়ার্ক অক্ষত থাকে। একজন গ্রেপ্তার হলে তার জায়গায় আরেকজন বসে যেতে পারে। একটি গ্রুপ দুর্বল হলে অন্য গ্রুপ সেই জায়গা দখল করতে পারে। তাই শুধু সংগ্রাহক নয়, কে নির্দেশ দিচ্ছেন, কে টাকা ভাগ করছেন, কার কাছে টাকা যাচ্ছে এবং কারা শেষ পর্যন্ত এই অর্থের সুবিধাভোগী, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
প্রয়োজন চাঁদাবাজির অর্থপ্রবাহ অনুসরণ করা। কোন এলাকায় কোন খাতে কত টাকা আদায় হচ্ছে, কারা তা নিয়ন্ত্রণ করছে, টাকা কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছে, এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে পুরো নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করতে হবে।
ভুক্তভোগীরা কেন চুপ থাকেন? চাঁদাবাজির সবচেয়ে বড় শক্তি অনেক সময় অস্ত্র নয়, ভয়। ব্যবসায়ী জানেন, অভিযোগ করার পরও তাকে সেই এলাকায় ব্যবসা করতে হবে। পরিবহনশ্রমিক জানেন, পরদিন তাকেই আবার একই স্ট্যান্ডে যেতে হবে। ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জানেন, চাঁদা না দিলে তার দোকান উচ্ছেদ বা হামলার শিকার হতে পারে। এই ভয় থেকেই অনেক অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে না। তাই শুধু মামলা নেওয়ার ব্যবস্থা করলেই হবে না। অভিযোগকারীর পরিচয় ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দ্রুত তদন্ত করা এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে মিথ্যা অভিযোগের ক্ষেত্রেও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া থাকতে হবে, যাতে চাঁদাবাজি দমনের নামে কাউকে হয়রানি করা না হয়।
অর্থনীতির ওপরও চাপ : চাঁদাবাজির টাকা শেষ পর্যন্ত ব্যবসার খরচ বাড়ায়। পরিবহনে চাঁদা হলে তার প্রভাব পড়ে ভাড়ায়। বাজারে চাঁদা হলে তা পণ্যের দামে যুক্ত হয়। নির্মাণকাজে চাঁদা হলে বাড়ে প্রকল্প ব্যয়। ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ওপর চাঁদা পড়লে কমে যায় তার লাভের পরিমাণ। অর্থাৎ চাঁদার টাকা শেষ পর্যন্ত শুধু ব্যবসায়ী দেন না; এর একটি অংশ বহন করেন সাধারণ ভোক্তাও। আর যখন চাঁদাবাজির সঙ্গে অস্ত্র ও সহিংসতা যুক্ত হয়, তখন ক্ষতিটা শুধু অর্থনৈতিক থাকে না। তৈরি হয় জননিরাপত্তার সংকট।
প্রাণহানি বন্ধ হবে কবে? : সদরঘাটের মিতুলের মৃত্যু আবারও সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে, চাঁদাবাজির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে আর কত প্রাণ যাবে? একটি চাঁদার স্পটের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে একজনের মৃত্যু কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। এটি এমন একটি অবৈধ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভয়াবহ পরিণতি, যেখানে অর্থের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্ষমতা, প্রভাব ও সহিংসতা। চাঁদাবাজি তাই কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়। এটি ব্যবসা, নগর অর্থনীতি, জননিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি।