ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি সফরে যেতে পারেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামী সপ্তাহেই এই সফরটি অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে জানাচ্ছে ভারতের গণমাধ্যম এনডিটিভি। ঢাকা ও নয়াদিল্লির উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে তারা উল্লেখ করেছে, এই সম্ভাব্য সফরকে কেন্দ্র করে উভয় দেশের প্রশাসনিক স্তরে জোর প্রস্তুতি চলছে।
প্রস্তাবিত সূচি অনুযায়ী সফরটি বাস্তবায়িত হলে, দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই হবে ভারত ভূমিতে তারেক রহমানের প্রথম আনুষ্ঠানিক সফর। সফরকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। উক্ত বৈঠকে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত, সীমান্ত নিরাপত্তা পরিচালনা এবং সামগ্রিক আঞ্চলিক নিরাপত্তাসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু স্থান পেতে পারে।
এনডিটিভির দেওয়া তথ্যানুযায়ী, আগামী সপ্তাহের দ্বিতীয় ভাগে—বিশেষ করে ২০ থেকে ২৩ আগস্টের মধ্যবর্তী সময়ে—বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে যেতে পারেন। দুই দিনব্যাপী এই সফরটিকে পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় কর্মসূচি হিসেবে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। যদিও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সফরের সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ ও সময়সূচি নির্ধারণের বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে তারেক রহমান সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই নয়া দিল্লি থেকে তাঁকে ভারত সফরের কূটনৈতিক নিমন্ত্রণ পাঠানো হয়। তা ছাড়া, আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতের রাজধানীতে আয়োজিত হতে যাওয়া ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার জন্যও বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দৃশ্যপটে পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় ঢাকার সঙ্গে diplomatic কৌশল ও সম্পর্কের দিকগুলো নতুন করে পর্যালোচনা করছে দিল্লি।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। এই ঘটনার পর ঢাকা ও নয়া দিল্লির দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। বিশেষত, ভারতীয় ভূখণ্ডে শেখ হাসিনার অবস্থান এবং তাঁকে বাংলাদেশে হস্তান্তরের বিষয়ে ঢাকার পক্ষ থেকে উত্থাপিত অনুরোধকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে নীতিগত দ্বিমত দেখা দেয়।
তবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন প্রশাসন ভারতের সাথে গঠনমূলক সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করার অভিপ্রায় প্রকাশ করেছে। সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা ও যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত এপ্রিল মাসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লি সফর করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন।
অধিকন্তু, গত ১০ আগস্ট ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেন ভারতে নিযুক্ত হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। সেই বৈঠকে দুই দেশের বিরাজমান সম্পর্কের পরিবেশ উন্নয়নে সম্ভাব্য পথ ও কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ ত্যাগের পর থেকেই শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাঁর মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে দিল্লি কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁকে প্রত্যর্পণের দাবি পেশ করেছে। জবাবে ভারত সরকার জানিয়েছে, বিদ্যমান আইনি কাঠামো এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার আলোকে তারা এই হস্তান্তরের অনুরোধটি খতিয়ে দেখছে।
চলতি মাসের শুরুর দিকে দিল্লি থেকে সাংবাদিকদের সঙ্গে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল মতবিনিময় ঘিরে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ সরকার স্পষ্ট করে যে, দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়া অনুচিত। এর উত্তরে নয়াদিল্লি জানিয়েছে, উক্ত আয়োজনের সঙ্গে তাদের সরকারি কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
বিশেষ সূত্র উদ্ধৃত করে এনডিটিভি উল্লেখ করেছে, তারেক রহমান ও ভারতীয় হাইকমিশনারের সাম্প্রতিক বৈঠকেও শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের ইস্যুটি আলোচনায় আসে। এ ছাড়া, আসন্ন বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও ট্রানজিট সুবিধা, জ্বালানি সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক সংযোগ স্থাপনের মতো বাস্তবমুখী বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পেতে পারে। ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক কারণে দুই দেশের বিস্তৃত স্থলসীমানা ও পরিবহন যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে, যার ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনের ইতিবাচক বার্তা অন্যান্য খাতগুলোতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
যৌথ নদীর পানি বণ্টন ইস্যুটিও আলোচনায় আসতে পারে। ১৯৯৬ সালে সম্পাদিত ঐতিহাসিক গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির নির্ধারিত মেয়াদ আগামী ডিসেম্বর মাসে শেষ হতে যাচ্ছে। এ কারণে চুক্তিটি নবায়নের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে।
বাংলাদেশের সঙ্গে একটি টেকসই ও স্থিতিশীল সম্পর্ক রক্ষা করা ভারতের নিজস্ব ভূরাজনৈতিক স্বার্থেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশাল অভিন্ন সীমানা ছাড়াও বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা সুগম রাখতে গুরুত্ব বহন করে।