ভয়াবহ লোডশেডিং, ক্ষোভে ফুঁসছে মানুষ

আজহারুল হক ফরাজী

জাতীয়

প্রচন্ড গরমের মধ্যে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে সারাদেশের মানুষ। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের ঘাটতি তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাওয়ায় শহর

2026-08-14T15:40:55+00:00
2026-08-14T15:40:55+00:00
  শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬,
৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
ভয়াবহ লোডশেডিং, ক্ষোভে ফুঁসছে মানুষ
বিভিন্নস্থানে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ঘেরাও, সড়ক অবরোধ
আজহারুল হক ফরাজী
শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ৩:৪০ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
প্রচন্ড গরমের মধ্যে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে সারাদেশের মানুষ। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের ঘাটতি তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাওয়ায় শহর থেকে গ্রাম-সবখানেই দফায় দফায় বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতি পল্লী এলাকায়। কোনো কোনো অঞ্চলে ২৪ ঘণ্টায় মাত্র পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা বিদ্যুৎ মিলছে,  কোথাও টানা ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। অসহনীয় গরম, ঘুমহীন রাত, পানির সংকট ও কর্মজীবনে স্থবিরতার মধ্যে ক্ষোভ ক্রমেই বিস্ফোরণমুখী হয়ে উঠছে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবরুদ্ধ এবং সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে।

গত কয়েক দিনের জাতীয় গ্রিডের তথ্য বলছে, বিদ্যুতের সংকট এখন স্বাভাবিক লোডশেডিংয়ের মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ২৩৭ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন ও সরবরাহ হয়েছে ১৩ হাজার ৮৫৫ মেগাওয়াট। ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৩৮২ মেগাওয়াটে। এর আগের দিন রাত ১২টায় লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াট। মঙ্গলবার সর্বোচ্চ ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৫৩৭ মেগাওয়াট। 

গ্রামেই সবচেয়ে ভয়াবহ : লোডশেডিংয়ের বড় ধাক্কাটি সামলাতে হচ্ছে পল্লী এলাকার মানুষকে। দেশের প্রায় পাঁচ কোটি ২০ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহকের মধ্যে প্রায় চার কোটি গ্রাহক পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায়। কিন্তু কয়েক দিন ধরে এসব এলাকায় চাহিদার তুলনায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত কম বিদ্যুৎ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন। ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। রংপুরের গ্রামাঞ্চলে কোথাও ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে প্রায় ১৪ ঘণ্টা, কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা এবং গাজীপুরের কাপাসিয়ায় ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। শরীয়তপুরের জাজিরা, সিরাজগঞ্জের বেলকুচি, নেত্রকোনা, গোপালগঞ্জ, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারাও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার কথা জানিয়েছেন। গোপালগঞ্জে জেলা শহরেই প্রায় ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ উঠেছে। ১৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সেখানে কোনো কোনো সময়ে সরবরাহ মিলছে মাত্র ৯ থেকে ১০ মেগাওয়াট। নেত্রকোনায় পরিস্থিতি আরও কঠিন-চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় কোনো কোনো সময়ে গ্রাহক পর্যায়ে ৭২ থেকে ৭৯ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।

এবার শহরেও অন্ধকার : গ্রামাঞ্চলের ঘাটতি সামাল দিতে এবার রাজধানীসহ বড় শহরেও লোডশেডিং শুরু হয়েছে। ঢাকার কেরানীগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, বাড্ডা, পান্থপথসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে দিন-রাতে প্রায় ১২ ঘণ্টা, আড়াইহাজারে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের অভিযোগ রয়েছে। সাভার ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকাতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। চট্টগ্রামেও গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকট তীব্র হয়েছে। গ্যাসের অভাবে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ায় বন্দরনগরীর বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় বিদ্যুৎ যাচ্ছে। ফলে প্রচন্ড গরমে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

গরমে নাকাল জনজীবন : বিদ্যুৎ না থাকায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ। দিনের প্রচন্ড গরমে ফ্যান-এসি বন্ধ, রাতে ঘুমানোর উপায় নেই। বিদ্যুৎ না থাকায় পানির পাম্প চালানো যাচ্ছে না; অনেক এলাকায় পানির সংকটও দেখা দিয়েছে। গ্যাসের সংকটের কারণে বাসাবাড়িতে বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।

শিল্পকারখানার অবস্থাও নাজুক। গ্যাসের অভাবে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে না পারায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গ্রিডের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে লোডশেডিং যুক্ত হওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গাজীপুর, নরসিংদীসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কারখানার উৎপাদন কমে গেছে।

ক্ষোভ এবার রাস্তায় : দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে মানুষের ক্ষোভ এখন আর শুধু অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। টাঙ্গাইল, দিনাজপুর, পাবনাসহ বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবরুদ্ধ করার ঘটনা ঘটেছে। মুন্সীগঞ্জেও লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে পল্লী বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও করেছেন ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ।

বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি গ্যাসের জন্যও রাস্তায় নেমেছেন মানুষ। সিরাজগঞ্জে সিএনজি চালকেরা ২৪ থেকে ২৮ ঘণ্টা পর্যন্ত গ্যাসের অপেক্ষায় থেকেছেন। গ্যাস না পেয়ে চালকদের একটি অংশ সড়ক অবরোধও করেন। জামালপুরে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ ও নতুন সিএনজি স্টেশনের দাবিতে বৃহস্পতিবার সকালে জামালপুর-টাঙ্গাইল-ঢাকা মহাসড়ক প্রায় আড়াই ঘণ্টা অবরোধ করেন চালকরা। লোডশেডিং ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে উত্তেজনার কারণে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ইতোমধ্যে দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি নিজেদের অফিস, উপকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে চিঠি দিয়েছে।

সংকটের নেপথ্যে গ্যাস : বিদ্যুৎ সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি। মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধাক্কা লেগেছে। বৈরী আবহাওয়া ও কারিগরি সমস্যায় টার্মিনাল দুটির সক্ষমতা কমে গেছে। দুটি টার্মিনাল থেকে স্বাভাবিক সময়ে যে পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যায়, বর্তমানে তার তুলনায় প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি সরবরাহ হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে দেওয়া হয় ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু এলএনজি সংকটের মধ্যে তা একপর্যায়ে ৭০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে যায়। গতকাল তা বাড়িয়ে প্রায় ৮০ কোটি ঘনফুট করা হলেও পরে আবার কমে ৭৫ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে।

দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১২ হাজার ৪৭২ মেগাওয়াট। কিন্তু গ্যাসের সংকটে বর্তমানে এসব কেন্দ্র থেকে মাত্র তিন থেকে চার হাজার মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এর সঙ্গে কয়লা সরবরাহে বিঘ্ন এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিও কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে সংকট আরও তীব্র হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়লা খালাসে সমস্যা হওয়ায় পায়রা ও পটুয়াখালীর কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না। একই সময়ে আদানি পাওয়ার থেকেও ৪০০ থেকে ৫০০ মেগাওয়াট কম বিদ্যুৎ আমদানি হচ্ছে।

এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ ও গ্যাস পরিস্থিতি নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) মেরামত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপাতত লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা ও অপেক্ষা করা ছাড়া সরকারের হাতে আর কোনো উপায় নেই। মন্ত্রী বলেন, এফএসআরইউ সচল না থাকায় বিদ্যমান গ্যাসও জাতীয় গ্রিডে নামানো যাচ্ছে না। বিদেশি প্রকৌশলীরা টার্মিনাল মেরামতে কাজ করছেন। মেরামত শেষ হওয়ার পর নতুন বয়লার চালু করতে পুরো সিস্টেম টানা ৭২ ঘণ্টা বন্ধ রাখার প্রয়োজন হতে পারে। এতে সাময়িকভাবে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, সংকট মোকাবিলায় সরকার গ্যাস ও এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি শিল্পে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার বিভিন্ন পথ খুঁজছে। ভোলা থেকে কনটেইনারে গ্যাস শিল্পকারখানায় পৌঁছানোর উদ্যোগ এবং মালয়েশিয়া থেকে এলএনজি আনার বিষয়েও কাজ চলছে।



Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: