সংগ্রাম-ত্যাগে ইতিহাসের অংশ খালেদা জিয়া

সুজন দে

জাতীয়

১৫ আগস্ট,বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী নারী নেত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন। জীবদ্দশায় দিনটি ঘিরে

2026-08-14T17:39:25+00:00
2026-08-14T18:37:08+00:00
  শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬,
৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
গৃহবধূ থেকে রাষ্ট্রনায়ক
সংগ্রাম-ত্যাগে ইতিহাসের অংশ খালেদা জিয়া
সুজন দে
শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ৫:৩৯ পিএম  আপডেট: ১৪.০৮.২০২৬ ৬:৩৭ পিএম
সংগৃহীত ছবি
১৫ আগস্ট,বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী নারী নেত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন। জীবদ্দশায়  দিনটি ঘিরে ছিল রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সমর্থকদের নানা আয়োজন। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতায় এখন তাঁর জন্মদিন স্মরণ করতে হচ্ছে প্রয়াত নেত্রী হিসেবে।

২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর মৃত্যুর ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অনুষ্ঠিত জানাজায় লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি ঘটে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অনুষ্ঠিত সেই জানাজায় রাজধানীর রাজপথ জনসমুদ্রে পরিণত হয়। দেশীয় ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের  প্রতিবেদনে জানাজায় ‘মিলিয়ন’ মানুষের অংশগ্রহণের কথা বলা হয়েছে।

সেই বিদায় শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর শেষ বিদায় ছিল না, এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে কয়েক দশক ধরে সক্রিয় থাকা এক নেত্রীর প্রতি সাধারণ মানুষের আবেগ, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার এক অভূতপূর্ব প্রকাশ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও তাঁর জানাজায় নজিরবিহীন জনসমাগমের কথা তুলে ধরে।

বিএনপির কর্মসূচি:

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন উপলক্ষে দেশব্যাপী দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ কর্মসূচির কথা জানানো হয়। 

কর্মসূচির অংশ হিসেবে  শনিবার (১৫ আগস্ট) ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দলীয় কার্যালয় অথবা মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল আয়োজন করা হবে। এসব কর্মসূচিতে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা অংশ নেবেন।
 খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন উপলক্ষে ঢাকাসহ সারা দেশে বিএনপি এবং দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে এসব দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।

কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে শনিবার (১৪ আগস্ট) সকাল ১১টায় রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এতে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা উপস্থিত থাকবেন।

এ ছাড়া রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা, মহানগর, উপজেলা ও অন্যান্য পর্যায়ে দলীয় কার্যালয় কিংবা স্থানীয় মসজিদে অনুরূপ কর্মসূচি পালনের কথা রয়েছে। 

দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সব পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং সমর্থকদের এসব আয়োজনে অংশ নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে দলটি।

গৃহবধূ থেকে রাজনীতির শীর্ষে:

খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আগমন ছিল বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি ছাত্ররাজনীতি কিংবা রাজনৈতিক পরিবার থেকে উঠে আসেননি। স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দেশের কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি ধীরে ধীরে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন।

১৯৮০-এর দশকে বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণের পর শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের কঠিন অধ্যায়। তখন সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দেশের রাজপথ উত্তাল। সেই আন্দোলনে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন। গ্রেপ্তার, অন্তরীণ, রাজনৈতিক চাপ—কোনো কিছুই তাঁকে রাজপথ থেকে সরাতে পারেনি।

এই সময়েই তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘আপসহীন নেত্রী’ অভিধাটি।

১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে এরশাদ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। সেই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতৃত্বে ছিলেন খালেদা জিয়া।

গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায়ে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী:

১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পর দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন খালেদা জিয়া। এটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সাফল্য ছিল না, বাংলাদেশের নারী নেতৃত্বের ইতিহাসেও এটি ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা।

তাঁর নেতৃত্বে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়। শিক্ষা, বিশেষ করে নারীশিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তারে তাঁর সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ বাংলাদেশের সামাজিক পরিবর্তনের ধারায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিদেশি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক উদারীকরণের ক্ষেত্রেও তাঁর সরকারের সময় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

একজন নারী হিসেবে পুরুষপ্রধান রাজনৈতিক পরিসরে দেশের সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নিজের একটি আলাদা অবস্থান তৈরি করেন।

রাজনীতির প্রতিকূলতায়ও অটল:

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল প্রতিকূলতার মধ্যে নেতৃত্ব ধরে রাখা। ক্ষমতার বাইরে থেকেও তিনি বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে রাজপথের আন্দোলনে থেকেছেন। আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে দেশের সরকার পরিচালনা করেছেন।

২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বে জোটগত বিজয়ের পর দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তাঁর দ্বিতীয় সরকার দেশ পরিচালনা করে।

এরপর বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসে আরও কঠিন সময়। ২০০৭ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গ্রেপ্তার ও কারাবরণ করতে হয় তাঁকে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে কারাবাস, অন্তরীণ জীবন এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতা তাঁর পথকে কঠিন করে তুললেও বিএনপির নেতৃত্ব থেকে তিনি সরে দাঁড়াননি।

বরং সময়ের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় আরও দৃঢ় হয়েছে—তিনি হয়ে উঠেছেন বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে সংগ্রাম ও ধৈর্যের প্রতীক।

ব্যক্তিগত জীবনের ত্যাগ:

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সংগ্রামকে শুধু রাজপথের আন্দোলন দিয়ে বিচার করলে তাঁর জীবনের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁকে বহু কঠিন সময় অতিক্রম করতে হয়েছে।

স্বামী জিয়াউর রহমানের আকস্মিক মৃত্যু, দুই সন্তানকে নিয়ে একা হয়ে যাওয়া এবং এরপর দেশের রাজনীতির অন্যতম কঠিন সময়ে নেতৃত্ব গ্রহণ—সব মিলিয়ে তাঁর রাজনৈতিক উত্থান ছিল ত্যাগ ও সংগ্রামে পূর্ণ।

পরবর্তী জীবনে কারাবাস ও অসুস্থতার সময়ও তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে না যাওয়ার বিষয়টি তাঁর সমর্থকদের কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে।

ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে উত্তরাধিকার:

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর উত্তরাধিকার। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকে। তাঁর মৃত্যুর পর সেই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করার দায়িত্ব সামনে আসে তাঁর জ্যেষ্ঠ ছেলে তারেক রহমানের ওপর।

এখন সেই ইতিহাস আরও তাৎপর্যপূর্ণ। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

অর্থাৎ যে রাজনৈতিক পরিবারের একজন নারী স্বামীকে হারানোর পর রাজনীতির কঠিন ময়দানে এসে নেতৃত্বের শীর্ষে উঠেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর সেই পরিবারের পরবর্তী প্রজন্ম এখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে।

এ যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে নেতৃত্বের এক দীর্ঘ যাত্রা।

জন্মদিনে ফিরে দেখা সেই নেত্রীকে:

খালেদা জিয়ার জীবনকে কয়েকটি শব্দে ব্যাখ্যা করা কঠিন। তিনি ছিলেন সংগ্রামী, দৃঢ়চেতা এবং দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বের এক অনন্য উদাহরণ। রাজপথের আন্দোলন থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা, বিরোধীদলীয় নেতৃত্ব থেকে কারাবাস—জীবনের প্রতিটি পর্যায়েই তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন।

তাঁর মৃত্যুর পর যে বিপুল জনসমাগমে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেটিও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রতি মানুষের আবেগের একটি বড় প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকবে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে স্বামীর কবরের পাশে সমাহিত করা হয়, তিন বাহিনীর পক্ষ থেকে দেওয়া হয় রাষ্ট্রীয় সালাম।

তাই ১৫ আগস্ট এখন শুধু খালেদা জিয়ার জন্মদিন নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ অধ্যায়কে স্মরণ করার দিন।

একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, দীর্ঘ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের নেত্রী, গণতান্ত্রিক রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখ এবং শেষ জীবনে কোটি মানুষের ভালোবাসায় বিদায় নেওয়া এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব—এই দীর্ঘ পথই বেগম খালেদা জিয়ার জীবনকে বাংলাদেশের ইতিহাসে আলাদা করে রেখেছে।

তিনি নেই, কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রামের গল্প আছে। তাঁর ত্যাগের স্মৃতি আছে। আর সবচেয়ে বড় কথা—বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে তাঁর নাম স্থায়ী হয়ে গেছে।
 তাঁর জন্মদিনে তাই শ্রদ্ধার সঙ্গে ফিরে দেখা যায় সেই সংগ্রামী নারীকে—যাঁর জীবন বাংলাদেশের রাজনীতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে।


Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: