মালিবাগে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর রিকশাভ্যানে দিব্যি হালিমের দোকান শুরু করে ইয়াসিন। আগে সে হ্যাজাক বাতি জ্বালিয়ে দোকান চালাত। এখন সেই আলোতে পোশায় না। তাই ১৫০ ওয়াটের বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালায় সে। এ বাতির লাইন নেওয়া হয়েছে সরাসরি মূল লাইন থেকে। এ জন্য প্রতিদিন লাইনম্যানকে দিতে হয়ে ৫০ টাকা। পাশেই জুস বিক্রি করছে আরেকজন। সেও একই কায়দায় লাইন নিয়েছে। মালিবাগের ফুটপাথের বেশিরভাগ দোকানদার সরাসরি লাইন নিয়েছে। এখানে মিডলম্যান হিসেবে কাজ করে লাইনম্যান, দৈনিক টাকাও তোলে সে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ এলাকায় হাসপাতাল ও সড়কের ফুটপাথজুড়ে রয়েছে অসংখ্য দোকান। এসব দোকানের সিংহভাগকেই বিদ্যুতের চোরাই লাইন ব্যবহার করে লাইট ও ফ্যান চালাতে দেখা গেছে। এসব দোকান থেকে প্রতিদিন লাইট প্রতি তোলা হয় ২৫-৩০ টাকা। দুই বাতিতে ৫০ আর তিন বাতির জন্য দিতে হয় ৭০ টাকা। জানা যায়, শুধু মালিবাগ বা ঢামেক নয়- রাজধানীর সবখানেই ফুটপাথের ব্যবসা জমজমাট। লাখ লাখ দোকানে ব্যবহার হচ্ছে সরাসরি লাইন থেকে চুরি করা অবৈধ বিদ্যুৎ। এছাড়া রাজধানীর অসংখ্য বাজার, বস্তিঘর এবং লক্ষাধিক অটো-ইজিবাইকে চুরি করে ব্যবহার করা হচ্ছে বিদ্যুৎ।
গতকাল বৃহস্পতিবার ব্র্যাক সেন্টারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলা ও জরুরি অগ্রাধিকারসমূহ এবং একটি টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের পথ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, ‘রাত ১২টার পরও প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াটের বিপুল চাহিদা দেখা যাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হলো অগণিত ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ই-বাইক, ফুটপাতে অবৈধ সংযোগ- যেগুলো রাতে চার্জ বা সংযোগ দেওয়া হয়। এর একটি বড় অংশ অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের মাধ্যমে লাইন বা চার্জ করা হচ্ছে।’ এসব অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে সরকার অভিযান চালাচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী। সংকট নিরসনে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে উল্লেখ করে মন্ত্রী আরও বলেন, ‘এইটুকুই বলতে চাই, উই আর ওয়ার্কিং...এই ক্রাইসিসের সময় আসলে এখন আমার কিছু করার নাই।
অনুসন্ধ্যানে জানা যায়, ঢাকা শহরের ব্যস্ততম সড়ক ও ফুটপাতগুলোতে সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে অস্থায়ী হকারা উচ্চ ক্ষমতার এলইডি বাতি, টিউবলাইট ও ফ্যান জ্বালিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। এই ঝলমলে আলোর আড়ালে লুকিয়ে আছে সরকারি সম্পদ চুরির এক সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক। কোনো বৈধ মিটার বা অনুমোদন ছাড়াই পুরো ঢাকা শহরে প্রতি সন্ধ্যায় জ্বলছে কয়েক লাখ অবৈধ বাতি। একদিকে সাধারণ নাগরিকরা যখন অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের চাপে দিশেহারা, অন্যদিকে ফুটপাতের এই চোরাই লাইন থেকে অর্জিত কোটি কোটি টাকা চলে যাচ্ছে কিছু অসাধু কর্মকর্তা, প্রভাবশালী চক্র ও টহল পুলিশের একটি অংশের পকেটে। তথ্যমতে, ডিপিডিসি ও ডেসকোর কতিপয় অসাধু কর্মী এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছায়াতলে এই বিদ্যুৎ চুরির মহোৎসব চলছে। গুলিস্তান, ফার্মগেট, মতিঝিল, পল্টন, কারওয়ান বাজার, মিরপুর-১০ ও নিউ মার্কেটের মতো এলাকায় বিকেলের আলো কমতেই লাইনম্যান ও ক্যাডাররা সক্রিয় হয়ে ওঠে। সরকারি লাইটপোস্ট, ট্রান্সফরমার ও ফিডার বক্স থেকে মাকড়সার জালের মতো বিপজ্জনকভাবে হুকিং করে এই বিদ্যুৎ নেওয়া হয়। প্রতিটি দোকান থেকে দৈনিক ৮০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত আদায় করে সিন্ডিকেট। শুধু গুলিস্তান ও পল্টন এলাকাতেই আট হাজার দোকান থেকে দৈনিক প্রায় ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যার বাৎসরিক পরিমাণ প্রায় ৩৬ কোটি টাকা। অব্যাহত অভিযানের পরও গ্রাহক পর্যায়ে বন্ধ হয়নি বিদ্যুৎ চুরি। আবাসিক বাড়িঘর, শিল্প-কারখানা, ফুটপাত- সবখানেই বিদ্যুৎ চুরি চলছে।
গোলাপ শাহ মাজারের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দোকানি বলেন, দোকান খুললেই টাকা দিতে হয়। প্রতিদিন লাইনম্যান এসে টাকা নিয়ে যায়। এক বাতি ৩০ টাকা নেয়। আরেক দোকানি বলেন, বিদ্যুৎ বিল ২৫ টাকা নিয়ে যায়। কিছু বৈধ মিটারও দেখা গেছে, সেখানে খরচ একই। ২০ ওয়াটের একটি বাতিতে মাসে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা বিল হলেও আদায় করা হয় ৬০০-৯০০ টাকা। গুলিস্তানের পোশাক বিক্রেতা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সরাসরি বিদ্যুৎ অফিসকে কোনো বিল দেই না। প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু লোক এসে বাতিপ্রতি ১০০ টাকা নিয়ে যায়। টাকা না দিলে মুহূর্তের মধ্যে বাতি খুলে নেওয়া হয় এবং ফুটপাতে বসতে দেওয়া হয় না। আমরা জানি এটা চোরাই লাইন কিন্তু ব্যবসা করতে হলে ওদের কথা মতোই চলতে হয়।’
এ ব্যাপারে ডিপিডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম জানান, নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হলেও স্থানীয় অসাধু চক্রের কারণে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুনরায় সংযোগ দেওয়া হয়। নিচের তলার কর্মীদের যোগসাজশ ছাড়া এই নেটওয়ার্ক অসম্ভব। তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিদ্যুতের সিস্টেম লস ও চুরি বন্ধ করা খুবই জরুরি। ফুটপাথে কিছু কিছু জায়গায় মিটার রয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় বিদ্যুৎ চুরি করা হয়। এমন খবর পেলেই আমরা অভিযান পরিচালনা করি। চুরি বন্ধে ধারাবাহিকভাবে ডিপিডিসি অভিযান পরিচালানা করে। নিজস্ব ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে গত মাস বা চলতি মাসে পরিচালিত অভিযানের কোনো তথ্য দিতে পারেননি তিনি।
নগর বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী মো. মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ফুটপাতের এই অনিয়ন্ত্রিত ও চোরাই সংযোগ নগরবাসীর নিরাপত্তার জন্য এক মারাত্মক ঝুঁকি। অরক্ষিত তারের হুকিং, নিচু মানের ক্যাবল এবং অপরিকল্পিত সংযোগের কারণে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের শর্ট সার্কিট বা অগ্নিকান্ড ঘটতে পারে। বর্ষাকালে এই ঝুলে থাকা তার থেকে ফুটপাতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে সাধারণ পথচারী ও শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা আমরা অতীতেও দেখেছি।’ সরেজমিন অনুসন্ধান ও বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর তথ্যেমতে, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) ও ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র এবং টহল পুলিশের একটি অংশের ছায়াতলে চলছে হাজার কোটি টাকার এই বিদ্যুৎ চুরির মহোৎসব। বিদ্যুৎ চুরি কেন কমছে না জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিপিডিসির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আইনশৃঙ্খলার কিছু অবনতির কারণে সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ চুরি অনেকটাই বেড়েছে। বিভিন্ন ফুটপাতে আগে বিদ্যুৎ ব্যবহার হতো কোনো নির্দিষ্ট মিটার থেকে, ইদানীং সেটা জোর করে করা হচ্ছে। এছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক এলাকায় নিয়মিত অভিযান চালানো বা অ্যাকশন নেওয়া যাচ্ছে না। ফলে চুরি কিছুটা বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। বিদ্যুতের চুরি বন্ধে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া সরকারের জন্য জরুরি। চুরি যাওয়া বিদ্যুৎ সিস্টেম লস হিসেবে দেখানো হয়। অন্যদিকে বৈধ গ্রাহকদের পকেট কেটে এ লস পূরণ করা হয়। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া এভাবে প্রকাশ্যে ফুটপাথে বিদ্যুৎ চুরি সম্ভব নয়। তাদেরও শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) মোহাম্মদ ওসমান গণি বলেন, ‘ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা এবং অবৈধ সংযোগ বন্ধে পুলিশ বিদ্যুৎ বিভাগের সাথে যৌথভাবে কাজ করে। থানা পুলিশ বা টহল টিমের কেউ যদি এসব অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের চাঁদা আদায় বা সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত থাকে, তবে তা বরদাশত করা হবে না’।
বিদ্যুৎ চুরির বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ম. তামিম বলেন, চুরি যাওয়া বিদ্যুৎ তারা সিস্টেম লস হিসেবে দেখিয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি ভোক্তাদের কনজাম্পশন বেশি দেখিয়ে দিচ্ছে। এসব লস নিয়মিত ভোক্তাদের কাছ থেকে সমন্বয় করছে। বিদ্যুৎ খাতের লুণ্ঠন-চুরি বন্ধ করা জরুরি। না হলে কোনো পদক্ষেপই ফলপ্রসূ হবে না। তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ সংস্থার লোকজনের যোগসাজশ ছাড়া বিদ্যুৎ চুরি করা সম্ভব না। তারা সব জানে। তারপরও চুপ থাকে কারণ অনৈতিক সুবিধা পায়। এতে সরকার কোটি কোটি টাকা আয় বঞ্চিত হচ্ছে। এখনই জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।