নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় আর লবণাক্ততার কাছে হার মেনে একের পর এক পরিবার ছাড়ছে নিজেদের ভিটেমাটি। কৃষিজমি অনুর্বর হয়ে পড়ায় কমছে কাজের সুযোগ, ভেঙে পড়ছে জীবিকার ভিত্তি। বাধ্য হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকার মানুষ ছুটছেন খুলনা নগরীতে। কিন্তু শহরে এসে নিরাপদ ও স্থায়ী আশ্রয় না পেয়ে তাদের বড় একটি অংশ ঠাঁই নিচ্ছেন বস্তিতে। ফলে উপকূল হারানোর পর নতুন করে শুরু হচ্ছে অনিশ্চিত জীবনসংগ্রাম।
গত এক দশকে সিডর, আইলা, আম্পান, বুলবুল ও ইয়াসসহ একাধিক ঘূর্ণিঝড় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জনপদে ব্যাপক ক্ষতি করেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার বিস্তার। খুলনার কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছার পাশাপাশি সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের বিভিন্ন এলাকায় অনেক পরিবার হারিয়েছে বসতভিটা। কোথাও নদী গিলে নিয়েছে ঘরবাড়ি, আবার কোথাও লবণাক্ত পানির কারণে চাষাবাদ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
কয়রা উপজেলার মহারাজপুর এলাকার রহিমা বেগম জানান, কয়েক দফায় নদীভাঙনে তাদের বসতভিটা বিলীন হয়েছে। জমিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় ফসল ফলানোও সম্ভব হচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে শহরমুখী হতে হয়েছে তাদের।
দাকোপের পানখালি এলাকার রফিক মোড়ল বলেন, বছরের বড় একটি সময় কৃষিজমি পানিতে ডুবে থাকে। লবণাক্ত পানির কারণে ফসল উৎপাদনও আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। কৃষিকাজে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ায় ভবিষ্যতে কাজের সন্ধানে শহরে আসা ছাড়া উপায় থাকবে না বলেও আশঙ্কা তার।
উপকূলীয় এলাকা থেকে খুলনায় আসা এসব মানুষের একটি বড় অংশ বর্তমানে নগরীর বিভিন্ন বস্তিতে বসবাস করছেন। কেউ দিনমজুরি করছেন, কেউ রিকশা চালাচ্ছেন, আবার কেউ গৃহকর্মী কিংবা ছোটখাটো ব্যবসার ওপর নির্ভর করে সংসার চালাচ্ছেন। অনিয়মিত আয়, বাড়িভাড়া, বিশুদ্ধ পানির সংকট, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও নিরাপত্তাহীনতা তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
দাকোপের আমজাদ হোসেন বলেন, উপকূলে থাকতে নিজেদের জমি ছিল। এখন ভাড়া বাসায় থাকতে হয়। কাজ কখনো থাকে, কখনো থাকে না। এতে সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ পুরোনো এলাকায় ফিরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিও নেই।
পাইকগাছা থেকে কয়েক বছর আগে খুলনায় আসা হাসিনা খাতুনের অভিজ্ঞতাও একই। ঘূর্ণিঝড়ে ঘরবাড়ি ও সম্পদ হারানোর পর প্রথমে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন তিনি। পরে নগরীর একটি বস্তিতে ওঠেন। সেখানে পানি, পয়োনিষ্কাশন ও নিরাপত্তার নানা সমস্যা থাকলেও জীবিকার তাগিদে সেখানেই থাকতে হচ্ছে তাকে।
বাস্তুচ্যুত মানুষদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার তথ্য বলছে, খুলনা মহানগরের বস্তিগুলোতে উপকূলীয় এলাকা থেকে আসা জলবায়ু অভিবাসীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। গত এক দশকে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে বহু পরিবার নগরীতে এসে বসতি গড়েছে। তাদের অনেকেই স্থায়ী ঠিকানা ও প্রয়োজনীয় নথিপত্রের জটিলতার কারণে সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
কারিতাস খুলনার আঞ্চলিক পরিচালক অ্যালবিনো নাথ বলেন, জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রতিবছর বাড়ছে। তারা শুধু ঘরবাড়ি হারাচ্ছেন না, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে পড়ছেন। এ সংকট মোকাবিলায় মানবিক সহায়তার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও আইনি সুরক্ষা প্রয়োজন। একই সঙ্গে উপকূলীয় এলাকায় টেকসই জীবিকার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষের স্থানান্তর এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি ক্রমবর্ধমান বাস্তবতা। শুধু শহরে আশ্রয় দেওয়ার উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। উপকূলীয় এলাকায় দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামো, বিকল্প কর্মসংস্থান ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু বাস্তুচ্যুতি ঠেকাতে শুধু শহরের বস্তিতে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। উপকূলে মানুষের বসবাস ও জীবিকা টিকিয়ে রাখার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। নদীভাঙন ও লবণাক্ততা মোকাবিলা, দুর্যোগের ক্ষতি কমানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই পুনর্বাসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা না গেলে আগামী দিনে খুলনামুখী জলবায়ু অভিবাসনের চাপ আরও বাড়তে পারে।