ভূতুরে বিদ্যুৎ বিলে জনমনে উদ্বেগ

সোহাগ রাসিফ

জাতীয়

রাজধানীর যাত্রবাড়িতে একটি বাসায় ভাড়া থাকেন বেসরকারি চাকরিজীবী মোহাম্মদ শোয়াইব। ৪ রুমের বাসায় থাকছেন তারা ৮ জন চাকুরীজীবী। বৈদ্যুতিক পণ্য

2026-08-08T11:54:37+00:00
2026-08-08T11:54:37+00:00
  রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬,
২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
ভূতুরে বিদ্যুৎ বিলে জনমনে উদ্বেগ
সোহাগ রাসিফ
শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৫৪ এএম 
সংগৃহীত ছবি
রাজধানীর যাত্রবাড়িতে একটি বাসায় ভাড়া থাকেন বেসরকারি চাকরিজীবী মোহাম্মদ শোয়াইব। ৪ রুমের বাসায় থাকছেন তারা ৮ জন চাকুরীজীবী। বৈদ্যুতিক পণ্য বলতে ব্যাবহার করেন ১টি ফ্রিজ, ৪টি ফ্যান, ৮টি লাইট, ১টি চুলা। গ্যাসের সংকট ছাড়া কখনই ব্যাবহার করেন না বৈদ্যুতিক চুলা। বিদ্যুৎ বন্ধ করে তারা সকালে অফিসে যান, কেউ বিকেলে কেউ সন্ধ্যায় বাসায় ফিরেন। এই বাসায় প্রতিদিন একই  রুটিনে বিদ্যুৎ ব্যাবহার হচ্ছে। সাধারণত বিদ্যুৎ বিল ১৪০০ -১৫০০ টাকার মধ্যে থাকলেও গত জুন মাসে তারা দেখেছে ভূতুরে (অস্বাভাবিক) বিল।

মোহাম্মদ শোয়াইব ভোরের ডাককে জানান, গত এক মাস ধরে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) ওয়েবসাইটে তাদের প্রিপেইড মিটারে কত টাকা ব্যালেন্স আছে, তা দেখতে পারছেন না। জুলাই মাসের মাঝামাঝি হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে তারা ধাপে ধাপে ডাচ বাংলা ব্যাংকের অ্যাপ থেকে ৪ হাজার টাকা বিল পেমেন্ট করেন। এর পরও বিদ্যুৎ না এলে ডিপিডিসির সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে কল করেন। এই কর্মচারী মিটার নম্বর যাচাই করে জানায় এখনো ৯০০ টাকার বকেয়া বিল রয়েছে। পরে আবারও ১ হাজার টাকা পেমেন্ট করলে  বাসায় বিদ্যুৎ আসে। হঠাৎ এমন ভূতুরে বিল দেখে অবাক হলেন সবাই। কেন এমন হলো তাও তার জানা নেই। 

গত জুন ও জুলাই মাসের বিদ্যুৎ বিল নিয়ে শুধু রাজধানী নয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্য গ্রাহক এমন অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ তুলেছেন। পোস্টপেইড ও প্রিপেইড উভয় ধরনের গ্রাহকদের কাছ থেকেই এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। গ্রাহকের দাবি, দৈনন্দিন বিদ্যুৎ ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না থাকলেও আগের বা অন্যান্য মাসের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বিল এসেছে। প্রি-পেইড মিটারে অস্বাভাবিক দ্রুত ব্যালেন্স শেষ হয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। আর পোস্ট পেইড মিটারে কোথাও মিটার রিডিং সঠিকভাবে নেওয়া হয়নি, কোথাও অনুমাননির্ভর বিল করা হয়েছে। আবার কোথাও কয়েক মাসের ইউনিট একসঙ্গে যোগ হওয়ায় বিল বেড়ে গেছে। একই সাথে ডিপিডিসির অ্যাপ কিংবা ওয়েবসাইটে মিটারের বিল দেখতে গেলে সার্ভার ডাউন দেখাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে অসংখ্য গ্রাহক। অনেকে ডিজিটাল কারচুপি বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। এতে গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ ও উদ্বেগ বাড়ছে।

বিদ্যুতের অস্বাভাবিক বিল নিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের অভিযোগের মধ্যে একই অভিজ্ঞতা নিয়ে মুখ খুললেন জনপ্রিয় ইসলামি আলোচক ড. মিজানুর রহমান আজহারি। গত মঙ্গলবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, “হঠাৎ করে আমার বাসার বিদ্যুৎ বিলও বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। পরিচিত অনেকেরই একই অভিযোগ। আশাকরি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আমলে নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।”

এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে চায়ের দোকান কিংবা পাবলিক বাসেও শোনা গেছে ভূতুরে বিদ্যুৎ বিলে উদ্বেগ-উৎকন্ঠার গল্প। রাজপথেও গড়িয়েছে এই অস্বাভাবিক বিলের গল্প। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর মুক্তাঙ্গনে জ্বালানি তেল ও গ্যাস-সংকট, বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিল ও মূল্যবৃদ্ধিসহ নানা বিষয়ের প্রতিবাদ জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। তাদের দাবি, গত তিন মাসে আদায় করা সব ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের বিষয়ে অবিলম্বে গণশুনানির আয়োজন করতে হবে। দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রিপেইড ও পোস্টপেইড মিটারে ডিমান্ড চার্জ, মিটারভাড়া এবং অন্য সব অযৌক্তিক ও অবৈধ চার্জ অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। গত তিন মাসে ডিমান্ড চার্জ, মিটারভাড়া ও অন্যান্য খাতে গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত আদায়কৃত অর্থ কোনো আবেদন ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরত দিতে হবে।

এদিকে অস্বাভাবিক বিলের অভিযোগ অস্বীকার করে প্রতিবাদ জানিয়েছে  বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। গত সোমবার মন্ত্রনালয় জানিয়েছে, সম্প্রতি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কর্তৃক অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগ এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে। ইতোমধ্যে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল সংক্রান্ত যে সকল অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে তা বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিতরণ সংস্থাসমূহ কর্তৃক সমাধান করা হয়েছে। সুতরাং এ বিষয়ে কোনো প্রকার অপপ্রচার বা বিভ্রান্তি ছড়ানোর সুযোগ নেই। তবে কোনো গ্রাহকের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল বিষয়ক কোনো অভিযোগ থাকলে প্রমাণকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন করলে সে বিষয়ে অবশ্যই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, জুন মাসে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়েছিল। পাশাপাশি মিটার রিডিংয়ের অনিয়ম, বিলিং ত্রুটি বা কয়েক মাসের ইউনিট একত্রে সমন্বয়ের মতো কারণেও কিছু ক্ষেত্রে বিল অস্বাভাবিক হতে পারে। তবে জ¦ালানী বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিলিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার ঘাটতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতাও এ ধরনের সমস্যার অন্যতম কারণ। এছাড়া অর্থবছরের শেষে রাজস্ব আয় বা সিস্টেম লসের হিসাব সমন্বয়ের কারণেও বিল বেশি আসতে পারে।

ডিপিডিসির কর্মকর্তারা জানান, গত ৩ জুন দুই পর্যায়েই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। এ কারণে বাড়তি দামের চাপ পড়তে পারে। পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ, সঞ্চালন চার্জ ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। নতুন দাম জুন থেকেই কার্যকর করা হয়েছে। তবে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষকে বাড়তি বিলের চাপ থেকে রেহাই দিতে আবাসিক খাতের দুই শ্রেণির গ্রাহকদের ক্ষেত্রে বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহার করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন।
ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঠিক মিটার রিডিং, স্বচ্ছ বিলিং ব্যবস্থা এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির মাধ্যমে গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। একইসঙ্গে ভুল বিলের কারণে কোনো গ্রাহক যেন হয়রানি বা সংযোগ বিচ্ছিন্নের শিকার না হন, সে বিষয়েও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। 

বিদ্যুতের অতিরিক্ত বিল প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, জুন মাস থেকে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছি আমরা। মার্চ মাসে যে গরম ছিলজুন মাসে সে গরম ছিল না। যখন আমরা বলি যাদের বাড়তি বিল হয়েছে, বিলগুলো নিয়ে আসেন, তখন তো বিল নিয়ে কেউ আসে না। অনিয়ম বা অসদুপায়ের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি বিদ্যুৎ অফিসে অভিযোগ গ্রহণের জন্য আলাদা সেলও চালু করা হয়েছে।



Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: