ঢাকার ফুটপাত দখলের চিত্র বহু পুরোনো। কিন্তু এখন পরিস্থিতি আরও জটিল। শুধু ফুটপাত নয়, রাজধানীর প্রধান ও সংযোগ সড়কের বড় অংশও চলে যাচ্ছে অবৈধ দখলে। কোথাও হকারদের অস্থায়ী দোকান, কোথাও রিকশা-ভ্যানের গ্যারেজ, কোথাও বাস, লেগুনা ও সিএনজির অননুমোদিত স্ট্যান্ড, আবার কোথাও ব্যক্তিগত গাড়ির অবৈধ পার্কিং। নির্মাণাধীন ভবনের ইট, বালু, রড ও অন্যান্য সামগ্রীও দিনের পর দিন পড়ে থাকছে সড়কের ওপর। ফলে প্রতিনিয়ত সংকুচিত হচ্ছে যান চলাচলের পথ, বাড়ছে যানজট, বাড়ছে জনভোগান্তি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি আর কেবল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সংকট নয়; এটি রাজধানীর অর্থনীতি, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও নগর ব্যবস্থাপনার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। কোটি মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে দেশ।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, মহাখালী, গুলিস্তান, মতিঝিল, পল্টন, মিরপুর-১, মিরপুর-১০, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, বাড্ডা, রামপুরা, মালিবাগ, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, আবদুল্লাহপুর ও উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ জায়গায় ফুটপাত দখল হয়ে আছে। অনেক এলাকায় রাস্তার একাধিক লেনও দখল করে বসেছে অস্থায়ী দোকান, পার্কিং কিংবা পরিবহনের স্ট্যান্ড। যেখানে ৩০ ফুট প্রশস্ত সড়ক থাকার কথা, সেখানে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে মাত্র ১৫ থেকে ১৮ ফুট। ফলে সামান্য যানবাহনের চাপেই সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট।
পথচারী নেমে আসছেন সড়কে : ফুটপাতে হাঁটার জায়গা না থাকায় বাধ্য হয়ে মূল সড়কে চলাচল করছেন পথচারীরা। এতে একদিকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে যানবাহনের গতি আরও কমে যাচ্ছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন। অনেক জায়গায় ফুটপাত এতটাই দখল হয়ে গেছে যে হুইলচেয়ার কিংবা শিশুর প্রাম ঠেলে চলাচল প্রায় অসম্ভব।
অবৈধ পার্কিং ও বাসস্ট্যান্ডে নিত্য ভোগান্তি : রাজধানীর যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে অবৈধ পার্কিং ও অননুমোদিত বাসস্ট্যান্ডকে। এরই মধ্যে মহাখালী, ফার্মগেট, গাবতলী, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী ও আবদুল্লাহপুর এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় রাস্তার ওপর সারিবদ্ধভাবে বাস দাঁড়িয়ে থাকে। যাত্রী ওঠানামার নামে অনেক সময় ১০ থেকে ২০ মিনিট পর্যন্ত একটি বাস রাস্তার লেন আটকে রাখে। কোথাও আবার তিন-চার সারিতে বাস দাঁড়িয়ে থাকায় অন্য যানবাহনের চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। একইভাবে বিভিন্ন বিপণিবিতান, হাসপাতাল ও অফিসের সামনে ব্যক্তিগত গাড়ির অবৈধ পার্কিংও যানজট বাড়িয়ে দিচ্ছে।
নির্মাণসামগ্রীও দখল করছে রাস্তা : রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনের মালিকরা নিয়ম-কানুন উপেক্ষা করে সড়কের ওপর ইট, বালু, পাথর ও রড ফেলে রাখছেন। এতে রাস্তার কার্যকর প্রস্থ কমে যাচ্ছে। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এ ধরনের দখলের বিরুদ্ধে নিয়মিত জরিমানা ও আইনি ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়ায় পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।
যানজটে প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে লাখো কর্মঘণ্টা : সকালে অফিস শুরু এবং বিকেলে অফিস শেষে রাজধানীর প্রধান সড়কগুলো প্রায় অচল হয়ে পড়ে। এক সময় যেখানে ৩০ থেকে ৪০ মিনিটে গন্তব্যে পৌঁছানো যেত, এখন অনেক ক্ষেত্রে সময় লাগছে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। অফিসগামী মানুষ বলছেন, যানজট এখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। কর্মস্থলে দেরি, উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং মানসিক চাপ, সব মিলিয়ে নাগরিক জীবনের মান ক্রমেই অবনতি হচ্ছে।
অর্থনীতিতে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি : বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই)-এর গবেষণা অনুযায়ী, রাজধানীর যানজটের কারণে বছরে প্রায় ৩৭ হাজার থেকে ৫৫ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। এর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়। কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া। পণ্য পরিবহনে বিলম্ব। উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া। যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বৃদ্ধি। পরিবেশ দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি ঘণ্টায় মাত্র ৫ কিলোমিটারের আশপাশে নেমে এসেছে, যা বিশ্বের সবচেয়ে ধীরগতির মহানগরগুলোর একটি।
হকারদের বক্তব্য, পুনর্বাসন ছাড়া সমাধান নয় : হকাররা বলছেন, তারা শখ করে ফুটপাতে ব্যবসা করেন না। জীবিকার তাগিদেই সেখানে বসতে বাধ্য হন। তাদের দাবি, সরকার যদি নির্ধারিত স্থানে বৈধভাবে ব্যবসার সুযোগ দেয়, তাহলে তারা ফুটপাত ছেড়ে যেতে প্রস্তুত। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি মিললেও বাস্তবে কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা দেখা যায়নি।
কেন ব্যর্থ হচ্ছে উচ্ছেদ অভিযান? রাজধানীতে প্রায়ই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। কিন্তু কয়েক দিন পরই আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে সবকিছু। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রধান কারণ রাজনৈতিক প্রভাব। স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়া। পুনর্বাসনের অভাব। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা। নিয়মিত মনিটরিংয়ের ঘাটতি। আইনের ধারাবাহিক প্রয়োগ না হওয়া।
এ বিষয়ে বুয়েটের এআরআই-এর সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ অভিযানের পর আবার একই অবস্থা ফিরে আসে। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কঠোর নজরদারি এবং হকারদের বাস্তবসম্মত পুনর্বাসন। নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীতে একটি সমন্বিত স্ট্রিট ম্যানেজমেন্ট নীতি প্রণয়ন জরুরি। যেখানে ফুটপাত, রাস্তা, পার্কিং, গণপরিবহন স্টপেজ ও হকার ব্যবস্থাপনা একসঙ্গে পরিকল্পনা করা হবে।
সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনা : সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, হকারদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করেই ফুটপাত পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেছেন, হকারদের নিবন্ধন ও পুনর্বাসনের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে পর্যায়ক্রমে তা বাস্তবায়ন করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীকে যানজটমুক্ত করতে হলে হকারদের জন্য নির্ধারিত ট্রেডিং জোন গড়ে তুলতে হবে। ফুটপাত ও সড়ক দখলের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে। অবৈধ পার্কিং সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। অননুমোদিত বাসস্ট্যান্ড উচ্ছেদ করতে হবে। নির্মাণসামগ্রী সড়কে রাখার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ও সিসিটিভি নজরদারি বাড়াতে হবে। সিটি করপোরেশন, ডিএমপি, বিআরটিএ ও রাজউকের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে।
নগরবাসীর প্রত্যাশা : রাজধানীর মানুষ বছরের পর বছর একই সমস্যার মধ্যে বসবাস করছেন। নানা সময় অভিযান, ঘোষণা ও পরিকল্পনার কথা শোনা গেলেও বাস্তবে পরিবর্তন খুব কমই দৃশ্যমান। নগরবাসীর প্রত্যাশা, ফুটপাত পথচারীর জন্য এবং সড়ক যানবাহনের জন্য, এই মৌলিক নীতির বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে। মানবিক পুনর্বাসনের মাধ্যমে হকারদের বিকল্প কর্মপরিসর তৈরি, অবৈধ দখলমুক্ত সড়ক এবং কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে রাজধানীকে আবারও সচল ও বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত করা সম্ভব। অন্যথায় যানজট, সময়ের অপচয় এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির এই চক্র আরও গভীর হবে, যার ভার বহন করতে হবে পুরো দেশকেই।