রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদগুলো থেকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ব্যক্তিদের সরিয়ে দেওয়ার কঠোর অবস্থান নিয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। এমনকি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকেও নানাভাবে ‘বিতর্কিত’ -এমন কাউকেও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ন স্থানে বসাতে নারাজ সরকার।
প্রশাসনের সর্বস্তরে পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনা এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ঝুঁকি এড়াতে এই কৌশল নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগের শাসনামলের সুবিধাভোগী এবং রাজনৈতিক অনুগত কর্মকর্তাদের রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বা স্পর্শকাতর কোনো পদে আর রাখা হবে না বলেও জানায় সুত্রটি।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সাবেক বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নাল আবেদীন ফারুক এমপি ভোরের ডাককে বলেন, বিএনপি কখনো প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না।
শহীদ জিয়া থেকে খালেদা জিয়া, বর্তমানে তারেক রহমান গনতন্ত্র রক্ষা করেই রাজনীতি করছে। রাষ্ট্রের ভেতরে যারা ক্ষতি করতে বসে আছে, রাষ্ট্রের স্বার্থে তাদের সরিয়ে দেওয়াও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতারই অংশ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে ৫০ সদস্যের মন্ত্রীসভা গঠিত হয়। সেখানে দল ও জোটের বিশ্বস্ত সঙ্গীদের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী করা হয়। এদের মধ্যে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতা কিংবা সরকারের জন্য ঝুকিপূর্ন কেউই নেই। সেজন্য কেউ কেউ নানা বক্তব্যে বির্তকিত হলেও তাদেরকে মন্ত্রীত্ব থেকে না সরিয়ে বরং সংশোধন করেছে সরকার।
মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বাইরে সচিবালয়, পুলিশ, প্রশাসন, ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয়, রাষ্ট্রয়াত্ব নানা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা ও সাংবিধানিক বড় পদগুলোতে নিজস্ব বলয় তৈরি করছে বিএনপি।
বলয়ের বাইরে থাকা ব্যাক্তিদের কাউকে রদবদল, কাউকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়ে শূনস্থানে পদোন্নতি ও নতুন লোক বসাচ্ছে সরকার। অর্থাৎ বিএনপির জন্য ঝুকিপূর্ন ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সরকারের বিরুদ্ধে কাজ করবে এমন কাউকেই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ন পদে রাখা হচ্ছেনা।
কাদের ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ মনে করছে সরকার? সরকারি সূত্র ও নীতিনির্ধারকদের মতে, ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বলতে মূলত তিন ধরনের কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমত, যারা পেশাদারিত্বের বদলে নির্দিষ্ট দলের অনুগত হিসেবে কাজ করেছেন। দ্বিতীয়ত, যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বজনপ্রীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। এবং তৃতীয়ত, যারা অতীতে জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড বা অন্যায় আদেশ বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেন, আবেগের বসবর্তী হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা যায়না। পূর্ববর্তী সরকারের দোসররা এখনো দেশের ভেতরে ও বাইরে বসে সরকারের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করার জন্য মুখিয়ে আছে। তাই প্রশাসনে সংস্কার ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের অপসারণ অত্যন্ত জরুরি।
বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা জানান, মূলত প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং অতীতে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন করাই এই শুদ্ধি অভিযানের মূল লক্ষ্য। স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতো সংবেদনশীল দপ্তরগুলো থেকে বিতর্কিত ব্যক্তিদের সরিয়ে নিজস্ব বলয়ের কর্মকর্তাদের পদায়ন করার প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে।
প্রশাসনে শুদ্ধি অভিযান: বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকে সিভিল প্রশাসন ও পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। গত সোমবার ৩২ জন যুগ্ম সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। তাঁরা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জেলা প্রশাসকসহ (ডিসি) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। এঁদের প্রায় সবাই ২০১৮ সালে বিতর্কিত নির্বাচনের সময়ে জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন বলে জানা যায়।
বিতর্কিত ভূমিকা ও রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের অভিযোগে কয়েক দফায় ৬৭ জনেরও বেশি উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো হয়েছে।
গত ২৩ জুলাই পুলিশের ১৭ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে সরকারি চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ৩ জন উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি), ১২ জন অতিরিক্ত ডিআইজি এবং ২ জন পুলিশ সুপার কর্মকর্তা রয়েছেন।
এর আগে ৫ জুলাই ১৪ জন পুলিশের ডিআইজি, ১৮ জন অতিরিক্ত ডিআইজি এবং ১ জন পুলিশ সুপারসহ বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের ৩৩ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। তার আগে গত ২২ এপ্রিল পুলিশের ১১ জন উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) এবং দুজন অতিরিক্ত ডিআইজিকে বাধ্যতামূলক অবসর হয়।
জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এই কর্মকর্তাদের অনেকে পুলিশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে দায়িত্বে ছিলেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জানায়, সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারা অনুযায়ী, চাকরিকাল ২৫ বছর পূর্ণ হওয়া সাপেক্ষে সরকার জনস্বার্থে যেকোনো কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাতে পারে।
নতুন নিয়োগে দলীয় বলয়: গত শুক্রবার নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিবসহ রাষ্ট্রায়ত্ত ১২টি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়েছে সরকার। গুরুত্বপূর্ণ এসব পদে দলীয় নেতাদের এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, শুক্রবার সরকারের বিভিন্ন সংস্থায় যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তারা দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
সাম্প্রতিক আন্দোলনে দলের নেতা-কর্মীদের অবদান ও ত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবেই তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, আজ যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তারা কোনো অবস্থাতেই নিজেদের নীতি বিক্রি করবেন না এবং কখনোই মাথানত করবেন না।
সাংবিধানিক পদে পরিবর্তন: প্রশাসনের পাশাপাশি সাংবিধানিক পদেও পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে ইতোমধ্যে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সাংবিধানিক পদ থেকে সরে দাড়িয়েছেন মোঃ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। সরকারের পর্যালোচনায় ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচিত হওয়ায় রাষ্ট্রপতি পদ থেকে তাকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকার অত্যন্ত ধীরস্থির এবং সতর্ক কৌশল অবলম্বন করছে।
ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় গোয়েন্দা নজরদারি: সরকারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগীরা এখনো পরিস্থিতি ‘ঘোলাটে’ করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার বার্তা এবং আগস্ট মাসের স্পর্শকাতর দিনক্ষণগুলোকে কেন্দ্র করে কোনো অপচেষ্টা চলছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
এছাড়া রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের কয়েক ঘণ্টা পরেই মেট্রো স্টেশনের নিচ থেকে বোমা উদ্ধারের ঘটনার সাথে কোনো গভীর ষড়যন্ত্রের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়েও তদন্ত চলছে। আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত কর্মকর্তাদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে যাতে কোনো গোপন ষড়যন্ত্র সফল হতে না পারে।
যেকোনো মূল্যে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং অপ্রীতিকর পরিস্থিতি রুখে দিতে সরকার এখন জিরো টলারেন্স নীতিতে রয়েছে বলে জানিয়েছে নীতিনির্ধারকরা।