রাজধানীতে প্রতিদিন ব্যবহার হচ্ছে দেড় হাজার কোটি নিষিদ্ধ পলিথিন

সাইদুল ইসলাম

রাজধানী

নিষিদ্ধ তবুও দেদারছে বিক্রি হচ্ছে অপচনশীল পলিথিন। রাজধানীতেই প্রতিদিন ব্যবহার হচ্ছে প্রায় দেড় হাজার কোটি পিস পলিথিন। এর ব্যবহার আশঙ্কাজনকহারে

2026-07-28T09:55:43+00:00
2026-07-28T12:31:28+00:00
  বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬,
১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
রাজধানী
রাজধানীতে প্রতিদিন ব্যবহার হচ্ছে দেড় হাজার কোটি নিষিদ্ধ পলিথিন
সাইদুল ইসলাম
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬, ৯:৫৫ এএম  আপডেট: ২৮.০৭.২০২৬ ১২:৩১ পিএম
সংগৃহীত ছবি
নিষিদ্ধ তবুও দেদারছে বিক্রি হচ্ছে অপচনশীল পলিথিন। রাজধানীতেই প্রতিদিন ব্যবহার হচ্ছে প্রায় দেড় হাজার কোটি পিস পলিথিন। এর ব্যবহার আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে যাওয়ায় মাটি, পানি, বায়ু, পরিবেশ দূষণ ও জীববৈচিত্র্যের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। 

শুধু তাই নয় পলিথিনের যথেচ্ছ ব্যবহারে বর্ষাকালে নগর-মহানগরে পয়নিষ্কাশনে ড্রেন, নালা-নর্দমা ভরাট হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করছে। বর্তমানে এক হাজারের বেশি পলিথিন ব্যাগ উৎপাদনকারী অবৈধ কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে সাত শ’র বেশি কারখানা ঢাকায় রয়েছে। 

ট্রেড লাইসেন্স না থাকার সুযোগে পলিথিন ব্যবসায়ীরা কর ফাঁকি দিয়ে নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। 

পলিথিন নিষিদ্ধ করে একটি আইন করলেও তার তেমন একটা প্রয়োগ নেই। ফলে আগের চেয়েও এখন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে পলিথিন। পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিস্ক্রিয়তাকেই এর জন্য দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।  

সরেজমিন দেখা গেছে, ফুটপাত-কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে অভিজাত শপিংমলেও এখন প্রকাশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে পলিথিন। অবস্থা এমন যে সবাই মনে করছেন পলিথিন ব্যাগ ব্যবহারের নিষিদ্ধকরণ আইন নেই। অন্যদিকে, মোড়কজাতকরণে পলিথিনের ব্যবহারও বেড়েছে। যা আগে ছিলো না। 

বর্তমানে, বিস্কুট, চানাচুর, লবণ, দুধ, মুড়ি, চিনি, আটা, ময়দা, চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি, এমনকি শাড়ি-লুঙ্গি পর্যন্ত প্যাকেট করে সৌন্দর্য বৃদ্ধির কারণে ব্যাপক হারে পলিথিনের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব পলিথিন যত্রতত্র ফেলায় পানি বায়ু পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের মারাত্মক ক্ষতির পাশাপাশি মাটির উৎপাদন ক্ষমতা অনেক কমেছে। এতে আগের থেকে ফসল উৎপাদনও কমেছে।  

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পরিত্যক্ত পলিথিন দূষণের কারণে আমাদের বাস্তুতন্ত্র ও ভূমিতে ব্যাপক দূষণ ঘটায়। ফলে গাছপালা ও অন্যান্য প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। পলিথিন সাগরের তলদেশে জমে জীববৈচিত্র্য ও সামুদ্রিক জীবের মারাত্মক ক্ষতি করছে। 

পরিত্যক্ত মাইক্রোপ্লাষ্টিকে পরিণত হয়ে বাতাস, পানি ও খাবারের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করছে। 

এ অনুপ্রবেশের কারণে দীর্ঘ মেয়াদে ফুসফুস, কিডনীজনিত রোগ ও ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। পেটের পীড়া, হরমোনের সমস্যা, লিভারের সমস্যা এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ক্যান্সারের মত ভয়ংকর রোগের জন্য দায়ী পলিথিন  পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর তথ্য মতে, পলিথিন বর্জ্যসহ ব্যাপকভাবে অন্য বর্জ্য ফেলায় বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা বালু, কর্ণফুলী ও সুরমা নদী বাংলাদেশের অন্যতম দূষিত নদীতে পরিণত হয়েছে। পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যে এ নদীগুলোর মরণদশা। 

অন্যদিকে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা নদী দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য সাগরে গিয়ে পড়ে। সমুদ্রের তলদেশে প্লাস্টিক পলিথিনের স্তর যে হারে বাড়ছে তাকে আগামী ৫০ বছর পর সমুদ্রে মাছের চেয়ে পলিথিনের পরিমাণ বেশি হবে। রাজধানীতেই প্রতিদিন ব্যবহার হচ্ছে প্রায় দেড় হাজার কোটি পিস পলিথিন। পলিথিনের বাইরে দেশে প্লাস্টিকের ব্যবহারও বিপজ্জনক হারে বাড়ছে। 

বছরে রাজধানীতে গড়ে মাথাপিছু প্লাস্টিকের ব্যবহার ২৪ কেজির বেশি। প্লাস্টিক ও পলিথিনের মাত্রাতিরিক্ত এ ব্যবহারে ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ প্রকৃতি, ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে নদী ও সাগর। 

বাংলাদেশ পলিপ্রোফাইল প্লাস্টিক রোল অ্যান্ড প্যাকেজিং অ্যাসোসিয়েশনের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সারাদেশে একহাজারের বেশি পলিথিন ব্যাগ উৎপাদনকারী অবৈধ কারখানা রয়েছে। 

এর মধ্যে সাত শ’টির বেশি কারখানা ঢাকাসহ পুরান ঢাকার চকবাজার, কোতোয়ালি, সূত্রাপুর, বেগমগঞ্জ কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, ইসলামবাগ, কামালবাগ, জয়নাগ রোড, দেবীদাস ঘাট, কোতোয়ালি, বংশাল, সূত্রাপুর, ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, ফতুল্লা ও মৌলভীবাজারে অবস্থিত। পুরান ঢাকার পলিথিন কারখানাগুলো অধিকাংশই গোপন স্থানে অবস্থিত। 

এগুলো বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে, এটি একটি পলিথিন কারখানা। সবসময় কারখানাগুলোর বাইরে থেকে দরজা-জানালা বন্ধ করা থাকে। বাইরের গেইটে বড় বড় তালা ঝুলিয়ে ভেতরে চলছে পলিথিন উৎপাদনের কাজ।

অন্যদিকে, নগরীরর মিরপুর, কারওয়ানবাজার, তেজগাঁও, কামরাঙ্গীরচর ও টঙ্গীতেও প্রচুর ছোট-বড় পলিথিন কারখানা গড়ে উঠেছে। ঢাকার বাইরে বাকি কারখানাগুলো চট্রগ্রাম ও দেশের অন্যান্য জেলায় অবস্থিত। এসব কারখানা থেকে ঢাকাসহ সারাদেশে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকার পলিথিন কেনাবেচা হয়। এ হিসাবে বছরে অন্ততঃ ২০ হাজার কোটি টাকার নিষিদ্ধ পলিথিনের বাজার গড়ে উঠেছে। 

পরিবেশ অধিদপ্তর ও সিটি করপোরেশন অনুমতিবিহীন নিষিদ্ধ পলিথিনের দেদারসে উৎপাদন হলেও এর লাভের অধিকাংশ বিপণনকারীরা নিয়ে যাচ্ছে। 

এ বিষয়ে সাধারন মানুষের দাবি, সরকারকে এ ব্যাপারে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে পরিবেশের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর পলিথিন উৎপাদন এখনই পুরোপুরিভাবে বন্ধ করতে হবে। না হয় আমাদের ভবিষৎ প্রজন্ম চরম হুমকির মুখে পড়বে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)’র সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, নিম্নমানের প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি পলিথিন পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।  যেভাবে এর ব্যবহার বাড়ছে তা এখনই দমন করা না হলে আগামীতে পরিবেশের ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি সরকারের উচিত পাটের তৈরি ব্যাগ বা কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহারে জনগণকে সচেতন করা। 

পরিবেশ দূষণ রোধে নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট আইনের কঠোর প্রয়োগ করা হবে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, এমপি। তিনি মার্কেটের ব্যবসায়ী, ক্রেতা ও সাধারণ মানুষকে পলিথিনের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ব্যাগ ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন। 

তিনি জানান, গত ৬ মাসে ১৬৮টি পলিথিন বিরোধী মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ২০৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসময় ১৯ লাখ টাকার বেশি জরিমানা এবং ৫০ হাজার মেট্রিক টনের বেশি পলিথিন জব্দ করা হয়। 

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একবার ব্যবহার যোগ্য পলিথিন ব্যবহার বন্ধ করতে নির্দেশনা দিয়েছেন। সরকার ইতোমধ্যে পাতলা পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করে আইন করেছে। এখন আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। আমরা প্রথমে মানুষকে পলিথিন ব্যবহার বন্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করছি। এরপরও যদি পলিথিন ব্যবহার বন্ধ করা না হয়, তবে আমরা কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবো। 

পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী বলেন, নিষিদ্ধ পলিথিন মাটি, পানি, বায়ু ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এটি নগরের জলাবদ্ধতা সৃষ্টির অন্যতম কারণ। 

পলিথিন দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যবসায়ী, ক্রেতা ও সর্বস্তরের নাগরিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।


  বিষয়:   পলিথিন  নিষিদ্ধ  রাজধানী 


Loading...
Loading...

রাজধানী- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: