জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাককানইবি) ‘সমসাময়িক জনসংখ্যা ইস্যু, টেকসই উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য উৎপাদনমুখী বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। পরিকল্পিত বিনিয়োগের মাধ্যমে শিল্প ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের বিপুল জনশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে হবে।
শনিবার (২৫ জুলাই) সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সেমিনার কক্ষে পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত সেমিনারে প্রধান অতিথি ও প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটসহ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়ছে। জ্বালানি তেলের, বিশেষ করে ডিজেলের দাম বাড়লে কৃষি, পরিবহনসহ বিভিন্ন খাত কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়, তা দেশবাসী ইতোমধ্যে দেখেছে। এসব বাস্তবতা মোকাবিলায় সরকারকে জনগণের কাছে আরও বেশি দায়বদ্ধতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান উৎপাদনমুখী অর্থনীতির যে ভিত্তি তৈরি করেছিলেন, সেই ধারাবাহিকতায় পরিকল্পিত বিনিয়োগের মাধ্যমে শিল্প ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং নতুন দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন ও জিয়ারতের মধ্য দিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছে। সরকারের প্রথম দিকের সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে কৃষকদের ঋণের সুদ মওকুফ, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার এবং নারীদের ক্ষমতায়নে নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য। এর মাধ্যমে পরিবার ও সমাজে নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একাডেমিক, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক—এই তিন ধরনের বার্ষিক ক্যালেন্ডার থাকা উচিত। এতে শিক্ষার্থীদের সার্বিক বিকাশ নিশ্চিত হবে।
অধ্যাপক তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি মর্যাদাপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করছে। এটি মাথা নত করার নয়, বরং সম্মান ও আত্মমর্যাদা রক্ষার নীতি। বিগত সরকার জনগণকে সম্ভাবনার সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার পরিবর্তে তাদের ওপর বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য দেশের জনশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করে উন্নয়নের প্রধান শক্তিতে রূপান্তর করা।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. কে. এম. মোস্তাফিজুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন, সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. বখতিয়ার উদ্দিন এবং রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) খন্দকার নজমুল হাসান।
সেমিনারে সমসাময়িক জনসংখ্যাগত পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে জনসংখ্যার ভূমিকা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, জনমিতিক লভ্যাংশের কার্যকর ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করা হয়।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন বলেন, জনসংখ্যা বিশ্বের জন্য একটি বড় সম্ভাবনার সম্পদ। প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে মানুষের জন্য নতুন দক্ষতা ও কর্মক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। তাই বিপুল জনসংখ্যাকে দক্ষ জনসম্পদে পরিণত করতে শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবই বা নির্দিষ্ট নোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা বিকাশে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. বখতিয়ার উদ্দিন বলেন, শিক্ষাক্ষেত্রে নারীদের অগ্রগতি বাংলাদেশের বড় সাফল্য। তবে শিক্ষিত নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। সন্তান ও পরিবারের যত্ন নেওয়ার দায়িত্বসহ বিভিন্ন কারণে নারীরা কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছেন। শিক্ষিত নারীদের অর্থনীতিতে সম্পৃক্ত করতে ডে কেয়ার ও চাইল্ড কেয়ার সুবিধা, পার্ট-টাইম কাজ এবং রিমোট ওয়ার্কের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সেমিনারে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানের শেষে প্রশ্নোত্তর ও মতবিনিময় পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।