শিক্ষক ও হলের ক্যান্টিন কর্মচারীর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি এবং ছাত্রীদের গোপনে ভিডিও ধারণের অভিযোগের বিচার দাবিতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) সব একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছেন শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন।
টানা দুই দিনের আন্দোলনের পর বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) রাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিন দফা দাবি ঘোষণা করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা এ কর্মসূচির ঘোষণা দেন। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন ও কর্মসূচি অব্যাহত রাখার কথা জানান তারা।
শিক্ষার্থীদের তিন দফা দাবির মধ্যে রয়েছে— হলের ছাত্রীদের গোপনে ভিডিও ধারণের অভিযোগে অভিযুক্ত ক্যান্টিন কর্মচারী ইমাম হাসানের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা এবং ঘটনার আগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থতার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট হল প্রভোস্ট বডিকে জবাবদিহির আওতায় আনা; যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. রুবেল আনছার ও এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল ইসলামকে দ্রুত স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা; এবং সম্প্রতি গঠিত ‘স্পন্দন-২৪’ ক্লাবের নিবন্ধন বাতিল করা।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে তাদের দাবিগুলো নিয়ে আলোচনা হলেও কোনো সন্তোষজনক অগ্রগতি হয়নি। আইনি জটিলতার কথা উল্লেখ করে প্রশাসন সরাসরি সিদ্ধান্ত না নিয়ে সময়ক্ষেপণ করেছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। এ কারণে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সব একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এর আগে বুধবার (২৩ জুলাই) সকালে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক ও প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ করেন। পরে হাদি চত্বরে অবস্থান নিয়ে যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত শেষ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একাধিক বৈঠক করেছে। এসব বৈঠকে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি অভিযুক্ত ইমাম হাসানের পরিচালিত হল ক্যান্টিনের বরাদ্দ বাতিল, আবাসিক ছাত্রী হলে কর্মচারীদের মোবাইল ফোন বহন নিষিদ্ধ, দুই ছাত্রী হলে কোনো পুরুষ কর্মী নিয়োগ না দেওয়া এবং ক্যান্টিন পরিচালনায় কঠোর নীতিমালা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. রুবেল আনছারের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগে রিভিউ আবেদন পাওয়া গেলে পুনঃতদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মো. নুরুন্নবী জানান, ছাত্রীদের গোপনে ভিডিও ধারণের অভিযোগে অভিযুক্ত ইমাম হাসানকে পুলিশ গ্রেপ্তারের পর আদালতে হাজির করা হয়েছে। পুলিশের তথ্যমতে, তার বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২-এর বিভিন্ন ধারায় মামলা হয়েছে এবং এসব ধারায় জামিনের সুযোগ নেই।
প্রসঙ্গত, গত বুধবার বিজয়’২৪ হলের ছাত্রীদের ওয়াশরুমে গোপনে মোবাইল ফোন রেখে ভিডিও ধারণের অভিযোগে হলের ক্যান্টিনকর্মী ইমাম হাসানকে আটক করেন ছাত্রীরা। এ ঘটনায় আবাসিক ছাত্রীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
এর আগে গত ১৮ জুন এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে এক ছাত্রীকে মেসেঞ্জারে অশালীন বার্তা পাঠানো ও কুপ্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের পর তাকে ডিসিপ্লিন প্রধানের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ কেন্দ্রের গঠিত সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি বিষয়টি তদন্ত করছে।
অন্যদিকে, গত বছরের আগস্টে বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. রুবেল আনছারের বিরুদ্ধে এক ছাত্রী অশালীন আচরণ, যৌন হয়রানি ও অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ করেন। পরে অন্য বিভাগের আরও এক ছাত্রী তার বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ আনেন। অভিযোগ দুটি তদন্ত শেষে গত ২৬ ডিসেম্বর প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩৪তম সিন্ডিকেট সভায় একটি অভিযোগ থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হলেও অপর অভিযোগে দুই বছরের জন্য পাঠদান, পরীক্ষা গ্রহণসহ সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, তাদের দাবিগুলোর সুষ্ঠু ও সন্তোষজনক নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন ও কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।