সরকারি ও বেসরকারি স্কুল-কলেজে ভর্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত পুনর্বহাল হওয়ায় রাজধানীসহ সারা দেশে নতুন করে হাজার কোটি টাকার কোচিং বাণিজ্য চাঙা হয়ে উঠেছে।
দীর্ঘ ছয় বছর লটারি পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তির পর, আসন্ন শিক্ষাবর্ষ থেকে আবারও পরীক্ষা পদ্ধতি চালু হওয়ায় অভিভাবকরা তীব্র আর্থিক ও মানসিক চাপের মুখে পড়েছেন।
আগামী শিক্ষাবর্ষ ২০২৭ শুরু হতে এখনও প্রায় পাঁচ মাস বাকি থাকলেও অভিভাবকদের উদ্বেগকে পুঁজি করে শতাধিক কোচিং সেন্টার ভর্তি কার্যক্রম শুরু করেছে।
এরই মধ্যে ভালো-নামি প্রতিষ্ঠানে ভর্তির প্রতিযোগিতায় প্রস্তুত করতে অনেকেই সন্তানকে বসাচ্ছেন ভর্তি পরীক্ষার জন্য পড়ার টেবিলে। আবার অনেকে বাধ্য হয়ে কোচিংয়ের দিকে ঝুঁঁকছেন। পাশাপাশি নোট-গাইড প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে।
শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভর্তি পরীক্ষা দিলে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বাড়ে। এতে কোচিং-নির্ভরতা ও প্রতিযোগিতাও বেড়ে যেতে পারে। শিশুদের জন্য চাপমুক্ত শিক্ষা পরিবেশ থাকা উচিত।
আবার কেউ কেউ মনে করেন, শুধুমাত্র লটারি হলে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী ভালো স্কুলে ভর্তির সুযোগ পায় না। এমনিতেই বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নানা কঠিন রোগে আক্রান্ত। তার মধ্যে কোচিং-বাণিজ্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী।
এ ব্যাধি এমনই ব্যাপকভাবে সমাজকে গ্রাস করেছে যে অনেকের আশঙ্কা, এ থেকে মুক্তি নেই আমাদের। কিন্তু এই মারাত্মক ব্যাধি নিয়ে যত শোরগোল, তা নিরাময়ে কর্তৃপক্ষীয় উপায় অনুসন্ধান ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ততই অভাব।
অথচ কে না জানে, শিক্ষাব্যবস্থার ধ্বংস মানে জাতিকেই ধ্বংস করা। বর্তমানে শিক্ষাবিধ্বংসী এই কোচিং-বাণিজ্যের উৎপত্তি ও বিকাশের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণঘাতী প্রাদুর্ভাব ঘটছে।
গতকাল সরেজমিন রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, উত্তরা, বাড্ডা, রামপুরা, মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী ও পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, বহু কোচিং সেন্টার ব্যানার, লিফলেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে ইতোমধ্যে ক্লাসও শুরু হয়ে গেছে। ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহর ও জেলা-উপজেলাতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
অনেক অবিভাবকের অভিযোগ, লটারি পদ্ধতি থাকায় এতদিন ভর্তি নিয়ে অতিরিক্ত চাপ ছিল না। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষা ফিরিয়ে আনার ঘোষণার পর আবারও প্রতিযোগিতা, কোচিং নির্ভরতা এবং অতিরিক্ত খরচের মুখে পড়তে হচ্ছে।
তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) সূত্রে জানা গেছে, ভর্তি পরীক্ষার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও কী পদ্ধতিতে পরীক্ষা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ বিষয়ে শিগগিরই একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে।
মাউশির পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকার ধাপে ধাপে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবে। শিক্ষার্থীদের জন্য একটি কার্যকর ও মানসম্মত শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করছে। তিনি বলেন, আগামী শিক্ষাবর্ষে স্কুল-কলেজে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে ঠিক। তবে এই বিষয়ে এখনো কোনো নির্দেশনা আসেনি।
তবে এর আগে গত ১৬ মার্চ সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছিলেন, আগামী শিক্ষাবর্ষে নতুন করে স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তিতে পরীক্ষা নেওয়ার পদ্ধতিতে ফিরে যাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
ভর্তি ব্যবস্থায় পরিবর্তনের কথা জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ‘বছরের প্রথমে অ্যাডমিশন যেটা হয়, সেখানে আমরা লটারির পরিবর্তে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করতে যাচ্ছি। আগাম জানিয়ে দিলাম, যেন সবাই সুযোগ পায়। আমরা লটারি সিস্টেম উইথড্র করলাম, দ্যাটস ইট।’
তিনি বলেন, ‘লটারি পদ্ধতি মেধা যাচাইয়ের কোনো কার্যকর উপায় নয়। অংশীজনদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে একটি স্বচ্ছ ও যুক্তিসঙ্গত পদ্ধতি প্রয়োজন।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সারাদেশে ফের চাঙা হয়ে উঠছে কোচিং সেন্টারগুলো। স্কুলে ভর্তির সফলতার নানা প্রলোভন দেখিয়ে এরই মধ্যে রাজধানীসহ সারাদেশে বিভিন্ন এলাকায় ভর্তি কোচিংয়ের প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বুষ্ট, ব্যানার, নামকরা স্কুলগুলোর সামনেসহ বিভিন্ন স্থানে লিফলেটের মাধ্যমে অভিভাবকদের নানাভাবে আকৃষ্ট করে ভর্তি শুরু করেছে কোচিং সেন্টারগুলো। ঢাকার বাইরেও জোরকদমে চলছে ভর্তি কোচিং বাণিজ্য।
তথ্যমতে, রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, উত্তরা, বাড্ডা, রামপুরা, মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী ও পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক কোচিং সেন্টার ভর্তি কোচিংয়ের জন্য প্রস্তুত। এরই মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের ভর্তি নিয়ে ক্লাসও শুরু করে দিয়েছে। অনলাইন-অফলাইনে জোরেশোরে ভর্তি কোচিংয়ের প্রচারণা চালাচ্ছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান ভর্তি ফরম বিতরণ ও ক্লাস শুরুর তারিখও ঘোষণা করেছে। প্রথম ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বেশি দেখা যায়।
আরও জানা যায়, কোচিং সেন্টারে ভর্তিতে ৩ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত ভর্তি ফি নেওয়া হচ্ছে। আর মাসিক বেতন ধরা হচ্ছে ২ থেকে ৬ হাজার টাকা। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন শিফটে সপ্তাহে তিন থেকে চারদিন ক্লাস ও একদিন পরীক্ষা নেওয়া হয়। মালিবাগের অ্যাডভান্স মেলিন্ডা টাওয়ারে উদয়ন কোচিং সেন্টারে গিয়ে দেখা যায়, একটি কক্ষে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। ক্লাসে বসিয়ে কক্ষের সামনে ও সিঁড়িতে অপেক্ষা করছেন অভিভাবকরা।
উদয়ন কোচিং সেন্টারের স্বত্বাধিকারী শাহীদ আহমদ বলেন, ‘আমি ২৯ বছর থেকে কোচিং করাই। সাফল্য এই কোচিং সেন্টারে যারা পড়েছে তাদের কাছ থেকে জানতে পারেন। মাসখানেক আগেই নামকরা স্কুলগুলোতে ভর্তির জন্য কোচিং শুরু হয়েছে। আমাদের এখানে ভর্তি ফি ৫ হাজার টাকা আর মাসে বেতন আড়াই হাজার টাকা।’
কোচিং সেন্টারের সামনে কথা হয় খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা তানিয়া আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘গত বছর লটারিতে ভর্তি ছিল। আমার মেয়ে খিলগাঁও ন্যাশনাল আইডিয়ালে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। কোনো ভোগান্তি হয়নি। এবার মেয়েকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করাতে চাই। ভর্তি পরীক্ষা শুনে সে এরই মধ্যে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে।’
শিক্ষা বিশ্লেষকরা বলেন, একসময় স্কুলে ভর্তি মানেই ছিল ছোট্ট শিশুদের কঠিন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হওয়া। বিত্তশালীরা সন্তানদের কোচিং করিয়ে ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করতেন। বিপরীতে নিম্নবিত্ত পরিবারের অনেক সন্তান প্রস্তুতি ভালো না থাকায় ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পেত না। একই সঙ্গে ভর্তি প্রক্রিয়াকে ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি, তদবির ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগও ছিল ব্যাপক। লটারির সময় ভাগ্যের জোরে ভালো প্রতিষ্ঠানে অনেক নিম্ন আয় কিংবা কম মেধাবীরাও ভর্তির সুযোগ পেত। একটি প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ভর্তি হতো। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষা শুরু হলে শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্যও বাড়বে।
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু বলেন, ‘ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে নভেম্বর-ডিসেম্বরে। অথচ শিক্ষামন্ত্রী মার্চেই ঘোষণা দিলেন, আগামী বছর থেকে স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে তিনি কোচিং বাণিজ্য উসকে দিলেন। এখন অভিভাবকরা কোচিং সেন্টারে ছুটছেন। এটা ঠিক হয়নি।’
এ ব্যাপারে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ বলেন, ‘ভর্তি পরীক্ষার প্ররোচনা কেন হচ্ছে ঠিক বুঝতেছি না। সব শিক্ষার্থীকে শিক্ষার সুযোগ দিতে হবে। প্রাথমিকে ভর্তি শিক্ষার্থীর অধিকার। অনেক স্কুলে ভর্তি হতে আগ্রহী বেশি। সেখানে লটারি একটি ভালো পদ্ধতি ছিল। ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া মানে কোচিং বাণিজ্য শুরু হওয়া। এর মধ্য দিয়ে নানাভাবে প্রভাব বিস্তার ও অর্থনৈতিক লেনদেন ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে যায়। তাই ভর্তি পরীক্ষা কোনো ভালো ব্যবস্থা বলে মনে হয় না।