দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। নতুন সংশোধিত নীতিমালায় বদলি কমিটি থেকে অস্পষ্ট ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ রাখার বিধান বাতিল করা হয়েছে।
এর পরিবর্তে এখন থেকে স্থানীয় পর্যায়ের কমিটিতে বিদ্যোৎসাহী বা শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পাশাপাশি জাতীয় কমিটির নেতৃত্বেও পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং শিক্ষক বদলি প্রক্রিয়াকে আরও সুনির্দিষ্ট করতে যুক্ত করা হয়েছে সাতটি নতুন শর্ত।
গত বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশোধিত এই নীতিমালা জারি করে। মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে গত ২১ জুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলি ও পদায়নের জন্য উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয়—এই চার স্তরের কমিটি গঠন করে নতুন পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল।
তবে অনলাইন পদ্ধতির পরিবর্তে ম্যানুয়াল ব্যবস্থা চালু করা এবং উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় কমিটিতে সভাপতির মনোনীত দুজন করে ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষক সংগঠন ও শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে সমালোচনা তৈরি হয়।
নীতিমালায় ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্ট না থাকায় অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এতে বদলি প্রক্রিয়ায় বাইরের বা রাজনৈতিক প্রভাব বাড়তে পারে এবং স্বচ্ছতা ব্যাহত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এসব সমালোচনার পর নীতিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেয় মন্ত্রণালয়।
সংশোধিত নীতিমালা অনুযায়ী, চার স্তরের কমিটির কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ের কমিটিতে ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’র পরিবর্তে দুজন করে বিদ্যোৎসাহী বা শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি যুক্ত থাকবেন।
নীতিমালা অনুযায়ী, উপজেলা বা থানা কমিটির সভাপতি থাকবেন সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), জেলা কমিটির সভাপতি থাকবেন জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং বিভাগীয় কমিটির সভাপতি থাকবেন বিভাগীয় কমিশনার।
এদিকে জাতীয় কমিটির নেতৃত্বেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগের নীতিমালায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিবকে সভাপতি করা হলেও নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জাতীয় কমিটির সভাপতি হবেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি)। কমিটিতে সদস্য হিসেবে থাকবেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (বিদ্যালয়) এবং সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পলিসি ও অপারেশন)।
বদলিতে যুক্ত হওয়া ৭ নতুন শর্ত
নতুন সংশোধিত নীতিমালায় শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রে সাতটি নির্দিষ্ট শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
* কোনো সহকারী শিক্ষক বা শিক্ষিকার চাকরির মেয়াদ দুই বছর পূর্ণ না হলে তিনি বদলির জন্য আবেদন করতে পারবেন না।
* একবার বদলি হওয়ার পর তিন বছর পূর্ণ না হলে পুনরায় বদলির আবেদন বিবেচনা করা হবে না।
* সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে শূন্য পদ না থাকলে বদলি করা যাবে না।
* শিক্ষকের নিজস্ব আবেদন ছাড়া নিজ বিদ্যালয় থেকে অন্য বিদ্যালয়ে বদলি করা যাবে না। তবে জনস্বার্থ বা প্রশাসনিক বিশেষ প্রয়োজনে জাতীয় কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে তা করা যাবে।
* যেসব বিদ্যালয়ে পাঁচজন বা তার কম শিক্ষক রয়েছেন অথবা শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৪০-এর বেশি, সেসব বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক বদলি করা যাবে না।
* একই বিদ্যালয় থেকে একাধিক শিক্ষক বদলির আবেদন করলে জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
* একটি বিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ তিনজন শিক্ষককে ‘সংযুক্তি’ পদায়ন করা যাবে। পাশাপাশি শর্ত পূরণ সাপেক্ষে শিক্ষিকারা স্থায়ী ঠিকানা বা স্বামীর ঠিকানার কাছাকাছি বিদ্যালয়ে বদলির ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার পাবেন।
সংশোধিত নীতিমালা অনুযায়ী, কমিটিগুলোকে প্রতি মাসে অন্তত একবার সভা করে বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তি করতে হবে।
একই উপজেলা, জেলা বা বিভাগের মধ্যে বদলির আদেশ সংশ্লিষ্ট কমিটির অনুমোদনে জারি হবে। আর আন্তবিভাগ ও সিটি করপোরেশন এলাকার বদলির বিষয়গুলো জাতীয় কমিটি নিষ্পত্তি করবে।
নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের লটারির মাধ্যমে পদায়নের দায়িত্ব জেলা কমিটির কাছেই রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, নতুন নিয়ম চালুর ফলে প্রাথমিক শিক্ষক বদলি প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, তদবির ও অসচ্ছতা অনেকটাই কমবে।