গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার করতোয়া নদীর তীরসংলগ্ন বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও তীর সংরক্ষণ বাঁধ অবৈধ বালু উত্তোলন, মাটি কাটা এবং নির্বিচারে গাছ কর্তনের কারণে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র প্রশাসনের নজর এড়িয়ে বা প্রভাব খাটিয়ে এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। এর ফলে বাঁধের বিভিন্ন স্থানে ধস, ফাটল ও ভাঙন দেখা দিয়েছে।
গত ২৪ জুলাই দুপুরে উপজেলার কিশোরগাড়ী ইউনিয়নের দিঘলকান্দী এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ থেকে কয়েক লাখ টাকার গাছ কেটে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে জানতে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের সচিবের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সরকারি ছুটির কথা উল্লেখ করে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর তীরসংলগ্ন এলাকায় ড্রেজারের মাধ্যমে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক গঠন ব্যাহত হয় এবং তলদেশে গভীর গর্ত সৃষ্টি হয়। এতে পানির স্রোতের গতিবেগ বেড়ে গিয়ে বাঁধের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তীব্র স্রোতের কারণে বাঁধে ধস ও ফাটল সৃষ্টি হয় এবং সামান্য পানির চাপেই বড় ধরনের ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়।
২ নম্বর হোসেনপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তৌফিক আমিন টিটু বলেন, রাতের আঁধারে বালু, মাটি ও গাছ কাটা হয়। এসব ঘটনায় একাধিকবার ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জেল-জরিমানাও করা হয়েছে।
১ নম্বর কিশোরগাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বক্কর বলেন, আমার ইউনিয়নের বাঁধের এলাকা অনেক বড়। তারপরও গ্রাম পুলিশ দিয়ে নিয়মিত টহল দেওয়া হচ্ছে। রাতের বেলায় বালু, মাটি ও গাছ কাটার খবর পাই। এসব রোধে ইউনিয়ন পরিষদ সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে।
কিশোরগাড়ী ইউনিয়নের সদস্য সালাম বলেন, নদী ও বাঁধের এলাকা বিশাল হওয়ায় সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো কঠিন। তারপরও আমরা সর্বদা সতর্ক রয়েছি।
হোসেনপুর ইউনিয়নের সদস্য সেলিম জানান, গ্রামবাসী পালাক্রমে বাঁধ পাহারা দিচ্ছে, যাতে কেউ মাটি, বালু বা গাছ কাটতে না পারে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শতকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত করতোয়া নদীর তীরসংলগ্ন কিশোরগাড়ী ও হোসেনপুর ইউনিয়নের বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও তীর সংরক্ষণ বাঁধের বিভিন্ন স্থান থেকে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অতীতে বাঁধের ওপর রোপণ করা মূল্যবান গাছও বিভিন্ন সমিতির নাম ব্যবহার করে কেটে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত একটি প্রভাবশালী চক্রের কারণে কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার সাহস পান না।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, কিশোরগাড়ী এলাকার এক ব্যক্তি মানান-এর নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ থেকে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হয়েছে। একইভাবে বাঁধের গাছও কেটে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে ওই ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গত বন্যায় এই বাঁধের কারণে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি থেকে এলাকা রক্ষা পেলেও বর্তমানে বাঁধের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ধস, ফাটল ও ভাঙন দেখা দেওয়ায় কিশোরগাড়ী ও হোসেনপুর ইউনিয়নের শতাধিক পরিবার চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, অবৈধ বালু উত্তোলন ও গাছ কর্তনের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে এসব কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করা না হলে করতোয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ যে কোনো সময় বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। এতে হাজারো মানুষের জীবন, বসতভিটা ও সম্পদ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।