বাঙ্গালীর প্রতিদিনের রুটিনের অন্যতম একটি পানীয় হচ্ছে চা। দেশের বিভিন্ন চা বাগান থেকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ হয়ে ভোক্তাদের কাছে আসছে চা পাতা। আর গরম পানিতে তৈরি সেই চা পাতার চা পান করছেন দেশের কোটি কোটি ভোক্তারা। কিন্তু বাজারে হাত বাড়ালেই সহজেই যে চা পাতা বিভিন্ন প্যাকেটে পাওয়া যাচ্ছে সেটি কতটুকু স্বাস্থ্য বান্ধব ও উপকারী গুনসম্পন্ন?
লেমন গ্রাস মূলত জনপ্রিয় একটি বিদেশী ঘাস জাতীয় সবজি। লেমন গ্রাস দেখতে ধানগাছের মতো হলেও পাতা একটু চওড়া, লম্বা আর সূচালো। পাতা হাতে ঘষতেই ভেসে আসে টাটকা লেবুর সুবাস। এই সুগন্ধি পাতাই এখন রূপ নিচ্ছে স্বাস্থ্যকর চা পাতাতে। সম্পন্ন প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি এই চা পাতার এক কাপ চায়ে মিলছে লেবুর স্বাদ, সুবাস আর একাধিক ভেষজগুন। লেমন গ্রাস থেকে চা পাতা তৈরি করে ইতোমধ্যেই দেশজুড়ে সাড়া ফেলেছেন উত্তরের খাদ্য ভান্ডার হিসেবে পরিচিত নওগাঁর সীমান্তবর্তি উপজেলা সাপাহারের কৃষি উদ্যোক্তা মো: সোহেল রানা।
বর্তমানে কৃষি উদ্যোক্তা মো: সোহেল রানা তার বরেন্দ্র এগ্রো পার্কে বাণিজ্যিক ভাবে বিদেশী লেমন গ্রাসের চাষ শুরু করেছেন এবং সেই ঘাস থেকে তৈরি চা পাতা বাজারজাতকরণও শুরু করেছেন। বর্তমানে এই ভেষজগুন সম্পন্ন লেমন ঘাসের শুকনো ও কাঁচা পাতা চাপাতি হিসেবে স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। প্রতিদিনই সোহেল রানার বাগানে কোন না কোন এলাকার চায়ের ভক্তরা লেমন ঘাসের চা পাতা নিতে আসছেন। দামে সহজলভ্য হওয়ার কারণে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষরাও ঘাসের চায়ের স্বাদ নেওয়ার চেস্টা করছেন।
নওগাঁ শহরের বাসিন্দা মাহমুদ রেজা জানান তিনি সংবাদ মাধ্যমে এই লেমন ঘাসের চায়ের কথা জেনেছেন। তাই নিজেই এসেছেন বরেন্দ্র এগ্রো পার্কে ঘাসের চায়ের স্বাদ নিতে। তিনি লেমন ঘাসের পাতার চা খেয়ে সত্যিই মুগ্ধ হয়েছেন। বিশেষ করে চায়ের কেটলির গরম পানি থেকে বেরিয়ে আসা লেমন ঘাসের পাতা থেকে লেবুর ঘ্রান সত্যিই মন ও শরীর জুড়ে এক সতেজতা এনে দেয়। তিনি বেশ কিছু পরিমাণ লেমন ঘাসের চা পাতা বাসার জন্য নিয়েছেন। তবে এমন স্বাস্থ্যকর উপকরণের প্রচার-প্রচারণা তেমন একটা না হওয়ার কারণে এখনোও মোড়ের চায়ের দোকানের ক্রেতাদের কাছে পৌছেনি লেমন ঘাসের চায়ের গল্পকাহিনী।
জেলার পোরশা উপজেলা থেকে বরেন্দ্র এগ্রো পার্কে লেমন ঘাসের চা পাতা নিতে আসা আরেক ক্রেতা পরেশ কুমার জানান শুনেছি লেমন ঘাসের চা অনেক উপকারি। তাই ভেজালের এই দুনিয়ায় নিজের এবং পরিবারের জন্য নানা গুনে ভরপুর প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি চা নিতে সোহেল ভাইয়ের বাগানে এসেছি। আগে এই ঘাসের নামও জানতেন না তিনি। তবে এখানে এসে চা খেয়ে লোভে পড়েছেন অনেকেই। উৎপাদন প্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে এই চা। তবে এটি যদি বাজারে সহজ ভাবে পাওয়া যেতো তাহলে অনেক সাধারণ ক্রেতাদের জন্যও অনেক ভালো হতো।
বরেন্দ্র এগ্রো পার্কের স্বত্বাধিকারী ও কৃষি উদ্যোক্তা মো: সোহেল রানা জানান তিনি প্রথম বিদেশ সফরে গিয়ে জানতে পারেন এই লেমন ঘাসের বিষয়ে। বিশে^র বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে চীন, জাপান ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে এই ভেষজ উদ্ভিদের কদর অনেক অনেক বেশি। তারা পুষ্টিগুনে ভরা এই ঘাসকে সুপসহ বিভিন্ন জনপ্রিয় ও স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রধান সবজি হিসেবে গ্রহণ করেন এবং চায়ের পাতা হিসেবে ব্যাপক ব্যবহার করেন। ওই দেশের মানুষরা ভেষজগুন সম্পন্ন বিভিন্ন উদ্ভিদ ব্যাপক হারে গ্রহণ করেন বলে তারা দীর্ঘায়ু লাভ করেন এবং রোগবিহীন জীবন-যাপন করেন। মৃত্যুর পূর্ব সময় পর্যন্ত তারা রোগবিহীন বেঁচে থাকেন।
এছাড়া বিশ্ব নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এই লেমন ঘাসের উপকারিতার কথাও সাহাবীদের মাঝে প্রকাশ করে গেছেন। বিদেশীসহ আমাদের দেশের সচেতন মানুষদের কাছে লেমন ঘাস শুধু চা নয়, এটি ঔষধিগুণ সম্পন্ন একটি উপকারী উদ্ভিদ। এটি সর্দি-কাশি উপশম, হজমে সহায়তা, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং শরীরের ক্লান্তি দূর করতে লেমন ঘাসের কোন বিকল্প নেই।
সোহেল রানা আরো জানান তিনি ২০১৫সালে ঢাকার একটি হর্টিকালচার থেকে এই লেমন ঘাসের চারা সংগ্রহ করেন। পরবর্তিতে তার নিজ বাড়ির বাগানে এই ঘাসের চাষ করে প্রাথমিক ভাবে চা পাতা তৈরির কাজ শুরু করেন। এরপর ইউটিউব ও বিভিন্ন প্রশিক্ষণ থেকে শেখা পরিচর্যায় এখন তিনি বরেন্দ্র এগ্রো পার্কে বাণিজ্যিক ভাবে চাষ করছেন লেমন ঘাস। আর সেই ঘাস কেটে প্রাকৃতিক উপায়ে একটি বিশেষ গরম ঘরের স্মার্ট ড্রয়ারে পাতা শুকিয়ে বাজারজাত করছেন লেমন গ্রাস টি। বর্তমানে তিনি দেশের একটি বহুজাতিক একটি কোম্পানির মাধ্যমে চাটি বাজারজাত করছেন।
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে এবং অন্য কোন উপায়ে প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে এই ঘাসের চায়ের বিষয়টি দেশের সাধারণ মানুষদের মাঝে পৌছে দেওয়া যেতো তাহলে এটি উচ্চ মহলের অভিজাত পণ্য থেকে প্রতিটি বাড়ি এবং দোকানের চায়ের ভোক্তাদের কাছে পৌছানো সম্ভব হতো। আর ভোক্তারা এই স্বাস্থ্যকর চা পানের মাধ্যমে ভেষজগুন পেতেন।
তিনি আশা প্রকাশ করেন দ্রুতই নানা উদ্যোগ গ্রহণ ও দেশের সংবাদমাধ্যমের দ্বারা এই স্বাস্থ্যবান্ধব চা পাতাটি দেশের প্রতিটি ভোক্তাদের কাছে পৌছে যাবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো: মনজুর রহমান জানান একবার চারা লাগালেই গোড়া থেকে নতুন কুশি গজিয়ে বারবার ফলন দেয় লেমন গ্রাস। খুব বেশি রাসায়নিক সারও লাগে না। তাই কম খরচে লাভজনক চাষের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর পানীয়ের নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে এই সুগন্ধি ঘাস।
নতুন উদ্যোক্তাদের নতুন নতুন লাভজনক কৃষির সঙ্গে যুক্ত করতে জেলা কৃষি বিভাগ সব সময় কাজ করে আসছে। অন্যান্য লাভজনক ফসলের মতো দ্রুতই লেমন ঘাসও জেলাজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান উত্তরের খাদ্য ভান্ডার হিসেবে পরিচিত নওগাঁ। এখন নওগাঁ শুধু ধান চাষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নওগাঁতে প্রতিনিয়তই বিভিন্ন লাভজনক বিদেশী ফসল চাষের বিস্তার ছড়িয়ে পড়ছে। তার মধ্যে লেমন ঘাস অন্যতম। এই সকল লাভজনক ফসল চাষ করে যেন কৃষক ও উদ্যোক্তারা সহজেই সঠিক বাজারজাতের মাধ্যমে লাভবান হতে পারেন সেই বিষয়ে জেলা কৃষি বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে জেলা প্রশাসন নানা রকমের কর্মকান্ড অব্যাহত রেখেছে।
দেশীসহ বিদেশী বড় বড় ব্যবসায়ীদের নওগাঁয় উৎপাদিত পণ্যের প্রতি দৃষ্টি আর্কষন করতে জেলা প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে। তেমনি ভাবে লেমন ঘাস থেকে তৈরি চা পাতাটি জেলাসহ পুরো দেশে ছড়িয়ে দিতে বদ্ধ পরিকর।