ভোরের আলো ফোটার আগেই সুন্দরবনের গহীন নদী-খালের বুক চিরে ছোট ছোট ডিঙি নৌকা ভেসে চলে। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই ম্যানগ্রোভ বনের গভীরে পাড়ি জমান বনজীবীরা—কেউ বাওয়ালী (কাঠুরে), কেউ মৌয়াল (মধু সংগ্রাহক), আবার কেউ জেলে। যে সুন্দরবন উপকূলীয় লাখো মানুষকে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে মায়ের মতো আগলে রাখে, সেই বনের ওপর নির্ভরশীল এসব মানুষের জীবন কিন্তু নিরাপদ নয়। প্রতিদিন বাঘ, কুমির ও দস্যুর আতঙ্কের পাশাপাশি দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা আর কঠোর পরিশ্রমের সঙ্গে লড়াই করেই চলে তাদের জীবন। কষ্ট, হাড়ভাঙা পরিশ্রম ও নিত্যদিনের অভাব-অনটন যেন তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী।
খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার সুন্দরবন-সংলগ্ন দাকোপ, কয়রা, শ্যামনগরসহ বিভিন্ন উপজেলার লাখো মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। মাছ, কাঁকড়া, গোলপাতা ও মধু সংগ্রহই তাদের প্রধান জীবিকা। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার বিস্তারে তাদের জীবন-জীবিকা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। সুপেয় পানির সংকট ও কৃষিজমি নষ্ট হওয়ায় বিকল্প আয়ের পথও সংকুচিত হয়েছে।
বনজ সম্পদ আহরণে মৌসুমি নিষেধাজ্ঞার সময় দীর্ঘদিন বনে প্রবেশ করতে না পারায় আয় বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় অনেক পরিবার মানবিক সংকটে পড়ে। সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে অনেকে মহাজন বা দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নেন। পরে বন থেকে আহরিত সম্পদ কম দামে বিক্রি করতে হওয়ায় ঋণের বোঝা আরও বাড়তে থাকে।
বনজীবীদের অভিযোগ, বনের বিভিন্ন এলাকায় এখনো নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে। বৈধভাবে পাস-পারমিট সংগ্রহ করে বনে প্রবেশ করাও সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। অন্যদিকে বন সংরক্ষণের স্বার্থে সংরক্ষিত এলাকার পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ায় সম্পদ আহরণের সুযোগও আগের তুলনায় কমে গেছে। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করছেন বা কাজের সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছেন।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, সুন্দরবন-নির্ভর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৭ লাখ পরিবার প্রত্যক্ষভাবে বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। উপকূলীয় অঞ্চলের বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবিকা কোনো না কোনোভাবে এই বনকেন্দ্রিক। অথচ তাদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা, সহজ শর্তে ঋণ, জীবনবীমা কিংবা বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ এখনো পর্যাপ্ত নয়।
পরিবেশবিদ ও স্থানীয়দের মতে, সুন্দরবন রক্ষার পাশাপাশি বনজীবীদের টেকসই জীবিকা নিশ্চিত করা জরুরি। দাদনপ্রথা নিয়ন্ত্রণ, নিষিদ্ধ মৌসুমে বিকল্প কর্মসংস্থান, পর্যাপ্ত খাদ্য সহায়তা, সহজ শর্তে সরকারি ঋণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। সুন্দরবন যেমন দেশের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয়, তেমনি এই বন রক্ষায় নিরলস পরিশ্রম করা বনজীবীদের জীবন-নিরাপত্তা ও আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাও সময়ের দাবি।