স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর আবেদন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের কাছে পাঠানোর সুপারিশ করেছে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক)। একই সুপারিশ করা হয়েছে নেপালের ক্ষেত্রেও।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) জাতিসংঘে অনুষ্ঠিত ইকোসকের বৈঠকে সদস্য রাষ্ট্রগুলো সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত নেয়। বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
বৈঠকে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সালাউদ্দিন নোমান চৌধুরী বাংলাদেশ ও নেপালের পক্ষে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মসৃণ, টেকসই ও স্থিতিশীল উত্তরণ নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত প্রস্তুতিকাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইকোসকের সুপারিশের ভিত্তিতে আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২৪ নভেম্বরের আগে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমানে ওই তারিখেই বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় নির্ধারিত আছে।
এর আগে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) কাছে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণের আবেদন জানায়। পরে গত ৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এ বিষয়ে ব্যক্তিগত সহযোগিতা কামনা করেন।
গত জুনে সিডিপি বাংলাদেশের আবেদনকে সমর্থন জানালেও সময় কত দিন বাড়ানো উচিত, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সুপারিশ করেনি। তবে বিষয়টি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে উপস্থাপনের পক্ষে মত দেয়।
এ বিষয়ে সমর্থন আদায়ে সরকার কূটনৈতিক তৎপরতাও চালিয়ে যাচ্ছে। গত শুক্রবার বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ইকোসকের সভাপতি ও নেপালের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত লোক বাহাদুর থাপা এবং ইকোসকের সহসভাপতি ও আলজেরিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করেন। এছাড়া জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর স্থায়ী মিশনের প্রতিনিধি, ঢাকায় কূটনৈতিক মিশন এবং কাঠমান্ডুতে ইকোসকের সভাপতির সঙ্গেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
সরকারের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, গত কয়েক বছরে কোভিড-১৯ পরবর্তী পরিস্থিতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকটসহ নানা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের কারণে এলডিসি উত্তরণের জন্য নির্ধারিত পাঁচ বছরের প্রস্তুতিকাল পরিকল্পনামাফিক কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
সরকার আরও জানিয়েছে, নতুন প্রশাসন একটি নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগ, রপ্তানি এবং রাজস্ব আদায়ে গতি ফিরিয়ে আনতে সময় প্রয়োজন। তাই প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর আবেদন উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে পড়ার জন্য নয়; বরং টেকসই, সুশৃঙ্খল ও নির্বিঘ্ন উত্তরণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে করা হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রস্তুতিকাল বাড়ানো হলে ‘থ্রি আর’ শীর্ষক পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশল বাস্তবায়ন করা হবে। এই কৌশলের আওতায় আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা, ব্যবসা সহজীকরণ, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, রাজস্ব খাতের সংস্কার এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।