জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা, অন্যদিকে আমদানিনির্ভর গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলের চাহিদা পূরণে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে।
বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর বৈশ্বিক বাধ্যবাধকতার প্রেক্ষিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়, এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান উপাদান। এই সেক্টরের উন্নয়নে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর (এনজিও) প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, গ্রামাঞ্চলে সৌর বিদ্যুতের প্রসারে এনজিওগুলোর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। সৌর বিদ্যুতের সক্ষমতা ও ব্যবহার বাড়লে জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমবে এবং সাশ্রয়ী অর্থ সরকারের উন্নয়ন খাতে ব্যয় করা সম্ভব হবে।
আমরা যদি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ১০ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারি, তাহলে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমে যাবে এবং সাশ্রয় হওয়া অর্থ উন্নয়ন খাতে ব্যয় করা যাবে। এজন্য সরকার সৌর জ্বালানি সংক্রান্ত নীতিমালাও করেছে। বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীরা নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অর্থায়নের জন্য আগ্রহী। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে ফসিল ফুয়েলের প্রকল্পের জন্য কেউ অর্থায়ন করবে না।
সরকার সৌর প্যানেল ও ব্যাটারির ওপর কর সুবিধা দিয়েছে। তিনি এনজিওগুলোকে অনুদাননির্ভরতা থেকে সরে এসে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ব্যবহার করে ব্যবসাভিত্তিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
এই পরিবর্তনের পথে সরকারের পাশাপাশি গত দুই দশক ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে দেশের বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও)। প্রত্যন্ত গ্রামের বিদ্যুৎহীন মানুষের ঘরে সৌরবিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া, সৌরচালিত সেচ, বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট, উন্নত চুলা এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে এসব সংস্থা সরকারের সবচেয়ে বড় বাস্তবায়ন অংশীদার হিসেবে কাজ করেছে। অথচ জাতীয় পর্যায়ে তাদের অবদান নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না।
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সবচেয়ে বড় উদ্যোগের নাম সোলার হোম সিস্টেম (ঝঐঝ)। ২০০৩ সালে সরকারি মালিকানাধীন অবকাঠামো উন্নয়ন কোম্পানি ইডকল এই কর্মসূচি শুরু করে। শুরু থেকেই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় এনজিও, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি অংশীদারদের। বর্তমানে ৫৬টি অংশীদার প্রতিষ্ঠান এই কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। তাদের মাধ্যমে দুর্গম ও অফ-গ্রিড এলাকায় ৪১ লাখের বেশি সৌর হোম সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে, যার সুবিধা পেয়েছে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ।
এই কর্মসূচির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, সরকার একা এটি বাস্তবায়ন করেনি। বিশ্বব্যাংক, গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি (জিইএফ), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাইকা, জিআইজেড (জিআজি), ইউএসএআইডি, কেএফডব্লিউসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর অর্থায়নকে মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে দেশের এনজিওগুলো।
গ্রাহক নির্বাচন, ক্ষুদ্রঋণ প্রদান, সৌর প্যানেল স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিক্রয়োত্তর সেবা সবকিছুই তারা পরিচালনা করেছে। এই কর্মসূচিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে গ্রামীণ শক্তি।
এছাড়া ব্র্যাক, আরডিআরএস বাংলাদেশ, টিএমএসএস, আশা, ফ্রেন্ডশিপ, ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামসহ (এনডিপি) আরও অনেক সংস্থা দেশের বিভিন্ন এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস, সৌর সেচ ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (আইডিডিওএল) তথ্য অনুযায়ী, শুধু সৌর হোম সিস্টেম কর্মসূচিতেই মোট বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ৫২ হাজার ২৪০ মিলিয়ন টাকা (প্রায় ৫ হাজার ২২৪ কোটি টাকা)। এর মধ্যে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ এবং ৯৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে।
এসব অর্থ এসেছে সরকার ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে; এনজিওগুলো বাস্তবায়নকারী অংশীদার হিসেবে কাজ করেছে। সৌর হোম সিস্টেম কর্মসূচির মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৭৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ বিদ্যুতের সুবিধা পেয়েছে। একই সঙ্গে কেরোসিনের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, এ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ১১ লাখ ৪০ হাজার টন কেরোসিনের ব্যবহার এড়ানো সম্ভব হয়েছে। এর ফলে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনও কমেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৫৫৯ মেগাওয়াট। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ২৬৫ মেগাওয়াটই সৌরবিদ্যুৎ। বাকি অংশ জলবিদ্যুৎ, বায়ু, বায়োগ্যাস ও বায়োমাস থেকে আসে।
জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ এখনো ৫ শতাংশের কিছু বেশি। এই বাস্তবতায় সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। খসড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট এবং পরবর্তী ধাপে আরও বড় সক্ষমতা অর্জনের পরিকল্পনা রয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই লক্ষ্য অর্জনে সরকার কর অবকাশ, শুল্ক সুবিধা, নেট মিটারিং, সরকারি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহ এবং আইডকোলের মাধ্যমে সহজ শর্তে অর্থায়নের মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। সাম্প্রতিক নীতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি কর ছাড় এবং যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক সুবিধাও রাখা হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নীতিগত ঘোষণা যতটা এগিয়েছে, বাস্তবায়ন ততটা এগোয়নি। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণ, গ্রিড সংযোগ, বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি, অর্থায়নের জটিলতা এবং দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এখনও বড় বাধা হয়ে আছে। ফলে দেশি-বিদেশি অনেক বিনিয়োগকারী আগ্রহ দেখালেও প্রকল্প বাস্তবায়ন ধীরগতির।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেছেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা প্রযুক্তি নয়; বরং জমির স্বল্পতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অভাব।
তার মতে, ভবিষ্যতে বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাশাপাশি শিল্পকারখানা, সরকারি ভবন ও আবাসিক এলাকার ছাদকে কাজে লাগাতে হবে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলেন তিনি মনে করেন।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ঝুঁকি কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ দ্রুত বাড়াতে হবে। শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, এটি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তারও একটি কার্যকর উপায়।
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেছেন, বর্তমান প্রণোদনার বড় অংশ সীমিত। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আবাসিক গ্রাহক, সৌর সেচ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং সৌর প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের জন্যও সমান সুযোগ নিশ্চিত না করলে ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক এনজিওর শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, শুধু গ্রামীণ বিদ্যুতায়ন নয়, কৃষি, মৎস্য ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎপাদন ব্যয় কমাতেও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ছে। তবে উচ্চ প্রাথমিক বিনিয়োগের কারণে অনেক পরিবার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এখনও সৌর প্রযুক্তি গ্রহণে পিছিয়ে রয়েছেন। সহজ শর্তে ঋণ এবং ভর্তুকি বাড়ানো গেলে এই চিত্র বদলানো সম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সরকার, এনজিও, বেসরকারি খাত এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর। শুধু নতুন প্রকল্প ঘোষণা নয়, দ্রুত বাস্তবায়ন, বিনিয়োগবান্ধব নীতি এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে আগামী এক দশকে দেশের জ্বালানি খাতে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্পগুলো সম্প্রসারণ করা গেলে প্রতি বছর প্রায় ৩ লাখ ৭৭ হাজার টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমপরিমাণ কার্বনডাই অক্সাইড নির্গমন এড়ানো সম্ভব। এই নির্গমন হ্রাস আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে কার্বন ক্রেডিট হিসেবে নিবন্ধিত করা গেলে বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারবে।
আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী কার্বন বাজারে প্রতি টন কার্বন ক্রেডিটের মূল্য সাধারণত ৫ থেকে ২০ মার্কিন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করে। সে হিসাবে বছরে ৩ লাখ ৭৭ হাজার টন কার্বন ক্রেডিট পাওয়া গেলে সম্ভাব্য আয় হতে পারে প্রায় ১৯ লাখ থেকে ৭৫ লাখ মার্কিন ডলার। বাজারদর ও প্রকল্পের মানভেদে এই আয় আরও বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্বন ক্রেডিটকে এখন থেকেই জাতীয় অর্থনীতির একটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আগামী দিনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণে সরকার, এনজিও, বেসরকারি খাত এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে আরও শক্তিশালী সমন্বয় প্রয়োজন। একই সঙ্গে কার্বন ক্রেডিট বাজারে প্রবেশের জন্য আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ী প্রকল্প নিবন্ধন, কার্বন হিসাব প্রস্তুত এবং পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।