প্রতি বছর বর্ষা এলেই যেন এক বিভীষিকার নাম হয়ে ওঠে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা। কয়েক ঘণ্টার মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিতেই পানির নিচে তলিয়ে যায় সড়ক, অলিগলি, বসতবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে যায়। হাঁটু থেকে কোথাও কোথাও কোমরসমান পানির মধ্যে চলাচল করতে বাধ্য হন নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা। বছরের পর বছর ধরে একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি হলেও স্থায়ী সমাধানের কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান না হওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, রাজনৈতিক পালাবদল হয়েছে, সংসদ সদস্য পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু ফতুল্লার মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। জলাবদ্ধতা যেন এখানকার মানুষের নিত্যসঙ্গী।
ফতুল্লার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান বারবার জলাবদ্ধতা নিরসনের আশ্বাস দিয়েছিলেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি জলাবদ্ধ এলাকা পরিদর্শনও করেছেন। বিশেষ করে নির্বাচনকে সামনে রেখে ভ্যানগাড়িতে করে জলাবদ্ধ এলাকা ঘুরে মানুষের দুর্ভোগ দেখার ঘটনাও আলোচনায় আসে। তবে স্থানীয়দের দাবি, এসব পরিদর্শন ও আশ্বাসের বাইরে কার্যকর কোনো স্থায়ী উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগের শিকার হতে হয়েছে ফতুল্লাবাসীকে।
গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য এডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা ছিল, নতুন নেতৃত্ব হয়তো দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে উদ্যোগ নেবেন। কিন্তু চলতি বর্ষায় আবারও পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় সেই আশাও ভেঙে গেছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
তাদের অভিযোগ, নতুন সংসদ সদস্য এখন পর্যন্ত জলাবদ্ধতায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক এলাকায় সরেজমিনে যাননি। ফলে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি কতটা অবগত, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ মানুষ।
ফতুল্লার বিভিন্ন এলাকায় কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার রাস্তায় পানি জমে যায়। অনেক স্থানে ড্রেন উপচে নোংরা পানি বাড়িঘরে ঢুকে পড়ে। কোথাও কোথাও ঘরের ভেতরে হাঁটুসমান পানি জমে থাকায় খাট, আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় মালামাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
শিশুদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। কর্মজীবী মানুষ সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেন না। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে বাধ্য হন মালিকরা। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
ফতুল্লার বাসিন্দা আরিফ বলেন,এমপি বদলেছে, কিন্তু আমাদের কষ্ট বদলায়নি। নতুন এমপি এখন পর্যন্ত আমাদের এলাকায় এসে মানুষের দুর্ভোগ দেখেননি। এই বর্ষায় আমরা খুব অসহায় হয়ে পড়েছি। বৃষ্টির পানিতে আমাদের ঘরবাড়ি ডুবে গেছে। ছোট ছোট সন্তান নিয়ে কীভাবে থাকব বুঝতে পারছি না।
আরেক বাসিন্দা নিরব হাওলাদার বলেন,প্রতিবারই শুনি জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হবে। খাল খনন হবে, ড্রেন হবে। কিন্তু বর্ষা এলেই সব প্রতিশ্রুতি পানির নিচে তলিয়ে যায়।
ব্যবসায়ী শাকিল হোসেন বলেন,দোকানে পানি ঢুকে লাখ লাখ টাকার মালামাল নষ্ট হচ্ছে। আমরা কর দিচ্ছি, কিন্তু নাগরিক সুবিধা পাচ্ছি না।
জলাবদ্ধতার কারণে শুধু চলাচলই ব্যাহত হচ্ছে না, তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকিও। নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকায় ডেঙ্গু, ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে চরম উদ্বেগে রয়েছেন অভিভাবকরা।
স্বাস্থ্য সচেতন নাগরিকদের মতে, জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে বর্ষা মৌসুমে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
স্থানীয়দের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, প্রাকৃতিক খাল-নালা ভরাট ও দখল, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার না করা এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতার কারণেই ফতুল্লার জলাবদ্ধতা বছর বছর ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
শুধু নতুন ড্রেন নির্মাণ করলেই হবে না। পুরো ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় এনে খাল পুনরুদ্ধার, পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত এবং অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতে হবে। অন্যথায় প্রতিবছর একই দুর্ভোগ চলতেই থাকবে।
ফতুল্লাবাসীর দাবি, আর আশ্বাস নয়—দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চান তারা। জলাবদ্ধতা নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে খাল-নালা পুনঃখনন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার এবং বর্ষার আগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
তাদের ভাষায়, প্রতিবছর বর্ষা আসে, পানি আসে, নেতা আসেন, প্রতিশ্রুতি আসে—কিন্তু সমাধান আসে না। আমরা আর আশ্বাস চাই না, স্থায়ী সমাধান চাই।
ফতুল্লার লাখো মানুষের এই দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কবে শেষ হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। তবে বর্ষার প্রতিটি বৃষ্টিতে পানিবন্দি মানুষের একটাই প্রত্যাশা—রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, দৃশ্যমান ও টেকসই সমাধান।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ ৪ আসনের সংসদ সদস্য আবুল্লাহ আল আমিন জানান, আমার মতে ফতুল্লা ইউনিয়িন সিটি কর্পোরশনে অন্তভূক্ত না করা পর্যন্ত এই জলাবদ্ধতা নিরস্ন সম্ভব নয়। কারণ ইউনিয়ন পরিষদ ও এলজিইডি যে বাজেট রয়েছে তা দিয়ে এই জলাবদ্ধতা নিরস্ন সম্ভব নয়। তবে আমরা সাময়িক সমাধাননের জন্য কিছু খাল কেটে পানি নামানোর চেষ্টা করছি।