আজ ১৮ জুলাই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও সংঘাতপূর্ণ একটি দিন। সেদিন ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে।
দিনভর উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে প্রাণহানি ও হতাহতের পাশাপাশি জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। সময়ের পরিক্রমায় দিনটি আন্দোলন, প্রতিরোধ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের এক স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে আলোচিত হয়ে আছে।
২০২৬ সালের এই দিনে পূর্ণ হলো ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সবচেয়ে আলোচিত ও রক্তক্ষয়ী দিনটির দুই বছর। ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সেদিন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ জেলায় ছড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষ, সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা।
দিনের শেষ ভাগে সরকার দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দিলে কার্যত বিশ্বের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বাংলাদেশ। আন্দোলনের ইতিহাসে ১৮ জুলাই পরিণত হয় এক মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া দিনে।
সেদিন বুকজুড়ে ক্ষোভ আর চোখে অধিকারের স্বপ্ন নিয়ে রাজপথে নেমে এসেছিল হাজারো তরুণ প্রাণ। দেশজুড়ে ডাক দেওয়া হয়েছিল ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির।
স্বৈরাচারের অবরুদ্ধ খাঁচা ভেঙে ছাত্র-জনতার সেই স্রোত যখন ধেয়ে আসছিল, তখন তৎকালীন ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার ক্ষমতার মসনদ টিকিয়ে রাখতে বেছে নিয়েছিল এক নির্মম, নিষ্ঠুর পথ।
রাজধানী ঢাকাসহ টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া….গোটা দেশ তখন এক অবরুদ্ধ নগরী। স্বাধীন দেশের বুকে নেমে এসেছিল যেন এক অঘোষিত যুদ্ধাবস্থা। আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখার অজুহাতে বুটের নিচে পিষে ফেলা হচ্ছিল মানুষের কণ্ঠস্বর; ঢাকাসহ সারা দেশে মোতায়েন করা হয়েছিল ২২৯ প্লাটুন বিজিবি।
কিন্তু তাতেও যখন দমানো যাচ্ছিল না অধিকার সচেতন সেই উত্তাল তরঙ্গকে, তখন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) রাজধানীতে অনির্দিষ্টকালের জন্য সকল প্রকার সভা-সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র নিজ দেশের নাগরিকদের ওপর কতটা ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী আচরণ করতে পারে, তার এক নগ্ন প্রদর্শনী চলছিল তখন।
আবু সাঈদ ও ওয়াসিম: বুলেটে বিদ্ধ হওয়া স্বপ্নেরা
এই নির্মমতার অগ্রভাগে, ঠিক দুদিন আগেই ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে রচিত হয়েছিল এক মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডি।
সেদিন ফ্যাসিস্ট সরকারের পেটুয়া পুলিশ বাহিনীর বন্দুকের নলের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ।
কোনো অস্ত্র ছিল না তার হাতে, ছিল কেবল এক বুক সাহস আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ। কিন্তু ফ্যাসিবাদের নিষ্ঠুর বুলেটের কোনো দয়া থাকে না। একের পর এক ছররা গুলিতে ঝাঁজরা করে দেওয়া হলো সাঈদের বুক।
পিচঢালা রাজপথে লুটিয়ে পড়ল এক অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ, যার রক্তে রঞ্জিত হলো বাংলার মাটি এবং সেই রক্তই হয়ে উঠল ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মূল স্ফুলিঙ্গ।
একই দিনে চট্টগ্রামের মাটিতে ঝরে গেল আরেক অকুতোভয় প্রাণ, ওয়াসিম আকরাম।
চট্টগ্রাম কলেজের এই ছাত্র দলের ভেদাভেদ ভুলে, কোনো লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে উঠে নেমেছিলেন স্বাধিকারের লড়াইয়ে। ফ্যাসিবাদের লালিত ক্যাডার আর পুলিশ বাহিনীর যৌথ বর্বরতার শিকার হন তিনি। বুকে বুলেট নিয়ে রাজপথেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ওয়াসিম।
স্বৈরাচারের নির্মমতা ও রক্তের হোলিখেলা
১৮ জুলাইয়ের সেই সকালে যখন পুরো দেশ শাটডাউনের চাদরে ঢাকা, তখন সাঈদ আর ওয়াসিমের রক্তভেজা শার্ট যেন হয়ে উঠেছিল প্রতিটি ছাত্রের বুকপকেট। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার সেদিন পুলিশ, র্যাব আর তাদের দলীয় ক্যাডার বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছিল নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর। রবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড আর তাজা বুলেটের আঘাতে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। আকাশছোঁয়া ক্ষোভের আগুনে সেদিন পুড়ছিল ফ্যাসিবাদের ভিত, আর তার বিপরীতে রাষ্ট্রযন্ত্র চালাচ্ছিল ইতিহাসের অন্যতম বর্বরোচিত দমনপীড়ন।
তারা ভেবেছিল বুলেট দিয়ে মুখ বন্ধ করা যাবে, রক্তগঙ্গা বইয়ে দিলে তরুণেরা ঘরে ফিরে যাবে। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি, আবু সাঈদ আর ওয়াসিমদের একেকটি রক্তবিন্দু ততক্ষণে কোটি তরুণের ধমনীতে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে।
সেই রক্তক্ষয়ী ১৮ জুলাই কেবল একটি তারিখ ছিল না, তা ছিল এক ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনঘণ্টার সূচনা এবং একটি নতুন, বৈষম্যহীন বাংলাদেশের জন্মলগ্নের রক্তিম ইশতেহার।