চরম অব্যবস্থাপনায় রাজধানীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, কার্যকরে পদক্ষেপ নেই

সাইদুল ইসলাম

রাজধানী

চরম অব্যবস্থাপনায় রয়েছে রাজধানীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা। কার্যকরে জোড়ালো পদক্ষেপ না থাকায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টার বৃষ্টিতে ডুবে যাচ্ছে পুরো ঢাকা

2026-07-14T12:24:17+00:00
2026-07-14T12:24:17+00:00
  বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬,
৩১ আষাঢ় ১৪৩৩
 
বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
রাজধানী
চরম অব্যবস্থাপনায় রাজধানীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, কার্যকরে পদক্ষেপ নেই
সাইদুল ইসলাম
মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬, ১২:২৪ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
চরম অব্যবস্থাপনায় রয়েছে রাজধানীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা। কার্যকরে জোড়ালো পদক্ষেপ না থাকায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টার বৃষ্টিতে ডুবে যাচ্ছে পুরো ঢাকা শহর। যার প্রমাণ মিলেছে গত রোববার। ওইদিন টানা বৃষ্টিতে পুরো ঢাকা শহর তলিয়ে যায়। এতে মহাদুর্ভোগে পড়েন রাজধানীর বাসিন্দারা। এ ভোগান্তি এখন নিত্যসঙ্গী নগরবাসীর। রোববারের বৃষ্টিতে অনেক এলাকায় এখনো জলজট রয়েছে। এর জন্য ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ও ঢাকা ওয়সাসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দূষছেন ভুক্তভোগীরা। 

তারা বলছেন, দুই সিটির সাবেক মেয়ররা দায়িত্বে থাকাকালীন ড্রেনেজ ব্যবস্থা কার্যকরের মাধ্যেমে জলাবদ্ধতা নিরসনে আশার কথা শুনালেও সফলতা দেখাতে পারেনি। বর্তমান দুই প্রশাসকও একই কথা শুনাচ্ছেন। কিন্তু ড্রেনেজ ব্যবস্থা কার্যকরের পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। এ বিষয়ে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন ঢাকার বাসিন্দারা।

নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি নগরীর জন্য ড্রেনেজ সিস্টেম বা নিস্কাশন ব্যবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ড্রেনেজ সিস্টেম প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম দুইটি উপায়ে হয়ে থাকে। আপস্ট্রিমের পানি গুলো কৃত্রিম উপায়ে বিভিন্ন সুয়েজ স্টর্মসুয়ের লাইনের মাধ্যমে নিষ্কাসিত হয় আর ডাউনস্ট্রিমের গুলো সরাসরি খাল-বিল-ঝিল-নালা তে গিয়ে নিষ্কাসিত হয়। মানুষের কাজকর্ম এবং প্রাকৃতিক পানি সাইকেল মধ্যে সম্পর্ক করার জন্য ড্রেনেজ সিস্টেম ডেভেলপ করা প্রয়োজন। 

প্রথমত, মানুষ প্রাত্যাহিক জীবনে গৃহাস্থলী কাজে, পয়ঃনিষ্কাশন, অফিস-আদালত-ইন্ড্রাস্ট্রিতে পানির বিভিন্ন ব্যবহার যা ড্রেন আউট করবে তার জন্য এই ড্রেনেজের প্রয়োজন। আর দ্বিতীয়ত, ভারী বর্ষণ, ঝড়-বৃষ্টিতে যেনে পানি না জমে যায় সেজন্য এই ড্রেনেজ সিস্টেম ডেভেলপ করা হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলায় ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নতি হচ্ছে না।

জানা যায়, দেশ গত দেড়দশকে যেমন বেড়েছে জনসংখ্যা তেমন বেড়েছে ডেভেলপমেন্টের কাজ। যার একটি বৃহৎ অংশ ঢাকাকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশের অন্য জেলা ও বিভাগীয় শহরের তুলনায় ঢাকায় জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি। 

এছাড়া, ঢাকায় প্রতিবছর নতুন করে ৩ লক্ষ লোক বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা থেক কাজ-কর্ম, চাকুরী, পড়াশুনার জন্য আসছে। যার কারণে ঢাকায় যত্রতত্র নগরায়ণ হয়েছে। ডেভেলপমেন্ট হয়েছে কোনও গাইডলাইন অনুসরণ না করেই। আর এই অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপেই ভেঙ্গে পড়েছে নাগরিক ব্যবস্থা। যারমধ্যে একটি অন্যতম এই ড্রেনেজ ব্যবস্থা। নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা বলতে শুধুমাত্র পাইপের কানেকশনগুলো বোঝায় না বরং ড্রেনেজ পাইপের সাথে প্রাকৃতিক জলাধারগুলো (যেমনঃ পুকুর, নদীনালা, খাল-বিল ইত্যাদি) সংযোগ। 

জনসংখ্যার অত্যাধিক চাপে এবং যত্রতত্র উন্নয়নের নিমিত্তে ঢাকায় অবস্থিত খাল-বিল পুকুর-ডোবা সমানে ভরাট করা হয়েছে এবং জলাধারগুলোকে রেসিডেন্সিয়াল, কমার্সিয়াল ব্যবহারের পরিবর্তন করা হয়েছে। এতে যেমন নষ্ট হয়েছে প্রাকৃতিক পানি সাইকেল তেমন নষ্ট হয়েছে ড্রেনেজ ব্যবস্থা। ফলে অকার্যকর ড্রেনের কারণে রোববার ঢাকাবাসীর জন্য চরম ভোগান্তির দিন। টানা বৃষ্টিতে বেশিরভাগ সড়ক-অলিগলিতে ছিল তীব্র জলাবদ্ধতা। দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে সর্ব শ্রেনী পেশার মানুষকে। 

সোমবারও সকাল থেকে ফের বৃষ্টি হওয়ায় একই পরিস্থিতি পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। এসময় দেখা যায়, বৃষ্টির মধ্যে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলেন অসংখ্য মানুষ। কিন্তু পর্যাপ্ত গণপরিবহন না থাকায় এ ভোগান্তি আরো বাড়ে। অনেকে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়ায় রিকশা কিংবা সিএনজিতে নিজের গন্তব্য স্থলে পৌঁছেছেন। আবার অনেকে ভিজে ভিজেই পায়ে হেটে গন্তব্যে পৌঁছেছেন। এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে জনদুর্ভোগ কমেনি। অনেক সড়কে হাঁটুসমান পানি জমে থাকায় যানবাহনের গতি অনেক কমেছে। এতে অফিসগামী এবং কর্মস্থল থেকে ফেরা মানুষকে দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকতে হয়। 

মগবাজার এলাকা থেকে মতিঝিল অফিসে যাওয়ার জন্য সড়কে অপেক্ষা করা বেসরকারি চাকরিজীবী আবদুর রহমান বলেন, রোববার তীব্র জলাবদ্ধতার মধ্যেই অনেক কষ্ট করে অফিস শেষ করে বাসায় যেতে হয়েছে। গতকাল সোমবার সকাল থেকে পেল বৃষ্টি হওয়ায় ভোগান্তি উপেক্ষা করেই কর্মস্থলে যেতে বাধ্য হয়ে বৃষ্টির মধ্যেই যেতে হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে সড়কে গণপরিবহনের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকায় আরো ভোগান্তি বেড়েছে। 

এদিকে, টানা ভারী বৃষ্টিতে রাজধানীর গুলশান-শাহজাদপুর লিংক রোডের একটি অংশ ধসে পড়েছে। পানির তীব্র চাপ ও দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধতার কারণে সড়কের নিচের মাটি সরে গিয়ে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এতে ওই সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। তবে ধসে যাওয়া অংশ ঘিরে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ অংশ এড়িয়ে ধীরগতিতে যানবাহন চলাচল করায় সড়কটিতে যানজটেরও সৃষ্টি হয়েছে। 

অপরদিকে, পুরান ঢাকার ধোলাইখালে সম্প্রতি সংস্কার শেষ হওয়া একটি সড়কের অংশ ধসে পড়েছে। ওয়াসার পুরোনো পানির পাইপে লিকেজের কারণে মাটির নিচে ফাঁপা জায়গা তৈরি হওয়ায় এ ধসের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত অংশে মেরামতকাজ শুরু হয়েছে। 

সোমবার (১৩ জুলাই) দুপুরে নারিন্দা মোড়সংলগ্ন রায়সাহেব বাজার থেকে মুরগিটোলামুখী সড়কের আইল্যান্ডঘেঁষা একটি অংশ দেবে গিয়ে বড় গর্তের সৃষ্টি হয়। দুর্ঘটনা এড়াতে ধসে যাওয়া অংশে ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে। তবে সড়কটি সংস্কার কাজ শেষে যান চলাচলের উপযোগী করতে প্রায় ১০ দিন লাগতে পারে।

তাছাড়া, টানা বৃষ্টির কারণে হাতিরঝিলে পানি বাড়ায় গুলশান থেকে হাতিঝিলের ওয়াটার ট্যাক্সি চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গুলশানের গুদারাঘাট ওয়াটার ট্যাক্সি ঘাটের কাউন্টারটি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ঘাটে কোনো ওয়াটার ট্যাক্সি নেই। কাউন্টারের সামনে একটি নোটিশ টানানো আছে, সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, পানি বেড়ে যাওয়ার কারণে গুলশান কাউন্টার থেকে ওয়াটার ট্যাক্সি চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। 

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পুলিশ প্লাজা সংলগ্ন ব্রিজটির উচ্চতা অন্যান্য ব্রিজের তুলনায় কম। তাই হাতিরঝিলে পানি বৃদ্ধির ফলে এই ব্রিজের নিচ দিয়ে ওয়াটার ট্যাক্সি আর চলাচল করতে পারছে না। এতে যাত্রীরা বিপাকে পড়েছেন। রাজধানীতে টানা বৃষ্টি হলেই এভাবে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে সর্বশ্রেনী পেশার মানুষকে। 

সরেজমিনে নগরীর অধিকাংশ সড়কে ঘুরে দেখা গেছে, সামান্য বৃষ্টি হলেই সড়কে আগের মতই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। অথচ বর্ষার পানি যাতে না জমে আরো তিন বছর আগে বিভিন্ন সড়ক সংস্কার করে মোটা পাইপ লাগানো হয়েছিল। কিন্তু যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকার্যকর থাকায় অল্প বৃষ্টিতে তলিয়ে যাচ্ছে ঢাকা। টানা বৃষ্টিতে তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দেয়ায় কর্মমুখী মানুষদের ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়তে হয়। সড়কে জলাবদ্ধতার কারণে তীব্র যানজটের পাশাপাশি পরিবহন সংকটও দেখা গেছে। 

স্থাপতি ইকবাল হাবিব বলেন, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, কেবল রাজধানীতেই নয়, বিভাগীয় জেলা-উপজেলা শহরেও মানসম্মত ড্রেনেজ, স্যুয়ারেজ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই। ফলে বর্ষাকাল ছাড়াও বছরব্যাপী মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বিশেষত স্কুলগামী ছাত্রছাত্রী ও নারী-শিশুদের ভোগান্তির শেষ থাকে না। সুষ্ঠু নগর ব্যবস্থাপনার অন্যতম শর্ত স্যুয়ারেজ ও ড্রেনেজ  ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। কিন্তু তা অনেকটা অকার্যকর থাকায় টানা বৃষ্টিতে নগরী ডুবে যাচ্ছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জোড়ালো নজরদারি প্রয়োজন।

এদিকে দেশের ওপর মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় রাজধানী ঢাকাসহ সাত বিভাগে অতি ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সেই সঙ্গে আগামী ২৪ ঘণ্টায় খুলনা ছাড়া বাকি সব বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি এবং কোথাও কোথাও অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে, যার ফলে দিনের তাপমাত্রা কিছুটা কমবে। তবে আজ মঙ্গলবার বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমে এলে সারাদেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে 
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন্নেসা। 

তিনি বলেন, বিভিন্ন অঞ্চল সমূহের ওপর দিয়ে দক্ষিণ বা দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। বৈরি আবহাওয়ার কারণে নদী উত্তাল থাকতে পারে বিধায় এসব এলাকার নদীবন্দরসমূহকে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।


Loading...
Loading...

রাজধানী- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: