মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়িতে অটিজম, বুদ্ধিবিকাশজনিত প্রতিবন্ধিতা, সেরিব্রাল পালসি ও ডাউন সিনড্রোমসহ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য নির্মাণাধীন ‘টঙ্গীবাড়ি সুবর্ণ স্কুল’-এর কাজ নির্ধারিত সময় পেরিয়েও শেষ হয়নি। নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় বিদ্যালয়টি চালু অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি, তদারকি এবং সময়মতো কাজ সম্পন্ন না হওয়ার কারণ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
রোববার (১২ জুলাই) সকালে টঙ্গীবাড়ি উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় ও থানা-সংলগ্ন নির্মাণস্থল পরিদর্শনে দেখা যায়, ভবনের মূল কাঠামোর কিছু অংশ নির্মিত হলেও ছাদের কাজ অসম্পূর্ণ। কলাম ও বিমের কাজ শেষ হয়নি। দরজা-জানালা, দেয়ালের প্লাস্টার, মেঝের কাজ, বৈদ্যুতিক সংযোগ, স্যানিটারি ব্যবস্থা, পানির লাইন ও রংসহ কোনো ফিনিশিং কাজ সম্পন্ন হয়নি। নির্মাণাধীন ভবনের চারপাশে আগাছা জন্মে রয়েছে, যা দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকার ইঙ্গিত দেয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালে গৃহীত তিন বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনার আওতায় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য ‘সুবর্ণ নাগরিকদের জন্য ১টি স্কুল’ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। তবে নির্ধারিত সময় শেষ হলেও নির্মাণকাজ শেষ হয়নি।
সোনারং-টঙ্গীবাড়ি ইউনিয়নের ৩৫ নম্বর মৌজার ২৮ শতক সরকারি খতিয়ানভুক্ত জমি বিদ্যালয় নির্মাণের জন্য নির্ধারণ করেন তৎকালীন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ওয়াজেদ ওয়াসীফ। পরে ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর জেলা পরিষদের অর্থায়নে নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান। সাত মাসের বেশি সময় পার হলেও প্রকল্পটি এখনও অসমাপ্ত।
দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, বিদ্যালয় ভবন নির্মাণে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি, বরাদ্দের তুলনায় বেশি কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং অবশিষ্ট কাজ শেষ করতে অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন।
এদিকে প্রকল্পটি টঙ্গীবাড়ি উপজেলা প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্রে-উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় ও থানা-সংলগ্ন এলাকায় নির্মাণাধীন হওয়ায় তদারকির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রশাসনের নিত্যকার কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থলে থাকা একটি সরকারি প্রকল্প দীর্ঘদিন অচল থাকলেও কেন সময়মতো সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেল না। নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা, সমন্বয় ও তদারকি আরও কার্যকর হলে প্রকল্পটি এভাবে থেমে থাকত কি না-সেই প্রশ্নও উঠেছে।
এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্বপ্নিল এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি মো. ইমন বলেন, প্রকল্পে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। এ পর্যন্ত ওই পরিমাণ কাজ সম্পন্ন করেছি। এখনও বিল পাইনি। কিছু প্রক্রিয়া শেষ হলে দ্রুত অবশিষ্ট কাজ শেষ করা হবে। তবে কাজ সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত বরাদ্দ প্রয়োজন।
অন্যদিকে জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী মো. আবুল হোসেন মিঞা বলেন, বিষয়টি নিয়ে জেলা পরিষদের প্রশাসক ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে এলে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।
ঠিকাদারের ২০ লাখ টাকার কাজ সম্পন্ন হওয়ার দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, না, ২০ লাখ টাকার কাজ হয়নি। এটি ঠিকাদারের দাবি। বরাদ্দও ২০ লাখ টাকা। উপজেলা প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও জেলা পরিষদ যৌথভাবে কাজের পরিমাপ (জয়েন্ট মেজারমেন্ট) করবে। কাজের পরিমাণ যাচাইয়ের পর বিলের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। আগে কাজ শেষ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, খুব দ্রুত কাজ শুরু করতে হবে। অন্যথায় বিধি অনুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত (ব্ল্যাকলিস্ট) করার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
এ বিষয়ে জানতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিনা আক্তারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেস্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেন নি।
স্থানীয়দের মতে, প্রকল্পটি চালু না হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা। যাদের জন্য বিদ্যালয়টি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তারা এখনও উপযুক্ত শিক্ষা-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাদের প্রত্যাশা, প্রকল্পের অচলাবস্থার কারণ নিরূপণ করে দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করে বিদ্যালয়টি চালু করা হবে।