নিম্নচাপের প্রভাবে উত্তাল বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরা কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলজুড়ে দেখা দিয়েছে গভীর সংকট। ভরা মৌসুমেও আশানুরূপ ইলিশ না মেলায় শত শত ট্রলার নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে এসেছে। ফলে আয় হারিয়ে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন হাজারো জেলে, আর কোটি কোটি টাকার লোকসানের মুখে পড়েছেন ট্রলার মালিক ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা। বৈরী আবহাওয়া, ইলিশের সংকট, ঋণের চাপ ও সমুদ্র দস্যুতার আতঙ্কে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দক্ষিণাঞ্চলের মৎস্যনির্ভর অর্থনীতি।
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে কয়েকদিন ধরে নিম্নচাপের প্রভাবে ভারী বৃষ্টিপাত ও ঝড়ো হাওয়া অব্যাহত রয়েছে। এর প্রভাবে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা এবং বরগুনার পাথরঘাটা, আমতলী, তালতলী, বেতাগী, বামনাসহ বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকায় ইলিশ আহরণ বন্ধ রয়েছে।
গত ৩ জুলাই থেকে উত্তাল সাগরে টিকতে না পেরে শত শত ফিশিং ট্রলার সুন্দরবনের দুবলা, আলোরকোল, মেহেরআলী, ভেদাখালীসহ বিভিন্ন নিরাপদ খাল এবং পাথরঘাটা, মহিপুর ও নিশানবাড়িয়া এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে। বর্তমানে সাগরে মাছ ধরার মতো কোনো ট্রলার প্রায় নেই বললেই চলে।
জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা জানান, ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে গেলেও আশানুরূপ ইলিশ মিলছে না। কয়েকদিনের বৈরী আবহাওয়ায় মাছ ধরা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রতিটি ট্রিপে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করা ট্রলারগুলোর পুরো চালান লোকসানে পরিণত হয়েছে।
শরণখোলা ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি মো. আবুল হোসেন বলেন, অশান্ত সাগরে টিকতে না পেরে ইলিশ আহরণ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সাগরে মাছ ধরা সম্ভব নয়।
তিনি জানান, শরণখোলা উপজেলায় দুই শতাধিক ফিশিং ট্রলার রয়েছে। প্রতি ট্রিপে একটি ট্রলার সাগরে পাঠাতে প্রায় তিন লাখ টাকা ব্যয় হয়। দুর্যোগের কারণে শুধু এ উপজেলাতেই প্রায় তিন কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মৎস্য ব্যবসায়ী হবিবুর রহমান ও মো. কবির হাওলাদার বলেন, ভরা মৌসুমেও সাগরে ইলিশের দেখা মিলছে না। তার ওপর বৈরী আবহাওয়া ও জলদস্যুদের উৎপাত পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একটি ট্রলার নিয়ে গভীর সমুদ্রে যেতে জ্বালানি তেল, বরফ, খাদ্য, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য খাতে এক থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত মাছ না পাওয়ায় সেই খরচও উঠে আসছে না। ফলে অনেকেই ব্যাংক, এনজিও কিংবা স্থানীয় মহাজনের ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। কেউ নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণের কিস্তি পরিশোধ করছেন।
উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বহু জেলে পরিবারের চুলায় নিয়মিত আগুন জ্বলছে না। অনেক পরিবার ধার-দেনা করে সংসার চালাচ্ছে। কেউ গবাদিপশু বিক্রি করছেন, কেউ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বন্ধক রাখছেন। বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় মাছ ধরা বন্ধ হলেই তাদের জীবন-জীবিকা থমকে যায়।
এদিকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সমুদ্রবন্দরে সতর্ক সংকেত জারি থাকায় ট্রলারগুলো নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করছে। কিন্তু ট্রলারের ঋণ, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য ব্যয় অব্যাহত থাকায় আর্থিক চাপ আরও বাড়ছে।
জেলেদের আরেকটি বড় উদ্বেগ সমুদ্র দস্যুতার আশঙ্কা। গভীর সাগরে দস্যুদের ভয়ে অনেক সময় নির্ধারিত এলাকায় মাছ ধরতে যেতে সাহস পান না তারা। একই সঙ্গে ইলিশের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে দাম বেড়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আড়ত, বরফকল, পরিবহন ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাত।
মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বরগুনা জেলায় প্রায় ৪৮ হাজার ৬০০ নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন। এছাড়া কয়েক হাজার অনিবন্ধিত জেলে সরকারি সহায়তার বাইরে রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর নাব্যতা সংকট, ডুবোচর সৃষ্টি, সমুদ্রের পরিবেশগত পরিবর্তন এবং অবৈধ কারেন্ট জাল ও ছোট ফাঁসের জালের ব্যবহার ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত করছে। ফলে আগের মতো ইলিশ মিলছে না।
শরণখোলা উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা অঞ্জন বিশ্বাস বলেন, নিম্নচাপের কারণে সাগরের পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত জেলেদের সাগরে না যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, দুর্যোগের কারণে সুন্দরবনের বিভিন্ন খালে আশ্রয় নেওয়া ট্রলারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বনরক্ষীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জেলেদের দাবি, শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেই হবে না; সহজ শর্তে ঋণ, জ্বালানি তেলে ভর্তুকি, অনিবন্ধিত জেলেদের নিবন্ধনের আওতায় আনা, সমুদ্র দস্যু দমন, বৈরী আবহাওয়ার সময় বিশেষ সহায়তা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের ভাষায়, সাগরে মাছ নেই, ঘরে খাবার নেই, অথচ ঋণের কিস্তি থেমে নেই।
উপকূলবাসীর আশঙ্কা, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ইলিশ সংকট আরও গভীর হবে এবং এর প্রভাব পুরো উপকূলীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি করবে।