মরক্কোর বিপক্ষে এক মহারণে মাঠে নেমে তৃতীয় বিশ্বকাপ শিরোপার লক্ষ্যে অভিযান শুরু করবে ফ্রান্স। এর মধ্য দিয়েই তারকাখচিত কোয়ার্টার-ফাইনাল পর্বের পর্দা উঠবে। সেমিফাইনালে ওঠার মহালড়াইয়ে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বর্তমান ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি ফ্রান্স এবং উত্তর আফ্রিকার সিংহ খ্যাত লড়াকু মরক্কো।
চলতি বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত অন্যতম সেরা দল ফ্রান্স। দারুণ ছন্দে খেলতে খেলতে শেষ আটে জায়গা করে নিয়েছে দিদিয়ের দেশমের শিষ্যরা। তবে শেষ ষোলোতে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়েছিল তাদের। কিলিয়ান এমবাপের পেনাল্টি গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে অল ব্লুজরা।
অন্যদিকে মরক্কোও দেখিয়েছে দুর্দান্ত সামর্থ্য। শেষ ষোলোতে কানাডাকে ৩-০ গোলে হারিয়ে আত্মবিশ্বাস নিয়ে শেষ আটে উঠেছে আটলাস লায়ন্সরা। গ্রুপ পর্বেও ছিল তাদের দাপট, ব্রাজিলের সঙ্গে ড্র করার পাশাপাশি হাইতি ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে স্বস্তির জয় পেয়েছে তারা। এবার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আজ রাত ২টায় যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের বিখ্যাত ফক্সবরোর জিলেট স্টেডিয়ামে (বোস্টন স্টেডিয়াম) এই মেগা ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে। ম্যাচটি ঘিরে বাড়তি আগ্রহের কারণ, এটি ২০২২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে। কারণ সেই ম্যাচে মরক্কোর স্বপ্নভঙ্গ করেছিল ফ্রান্স।
সব মিলিয়ে ম্যাচটি হতে যাচ্ছে দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ২০২২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছিল ফ্রান্স। যদিও শিরোপা লড়াইয়ে পরে আর্জেন্টিনার কাছে হেরে যায় তারা। চার বছর পর আবারও একই প্রতিপক্ষের সামনে দাঁড়িয়েছে ফরাসিরা।
ফ্রান্স এখনো এই ম্যাচে ফেভারিট হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। তবে মরক্কোও এখন আর অঘটনের দল নয়; বরং বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে তারা। কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের পর আবারও বিশ্বমঞ্চের নকআউটে এই দুই দলের দেখা হওয়ায় ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। কাগজে-কলমে এবং ফুটবল ইতিহাসের অতীত পরিসংখ্যানের দিক থেকে মরক্কোর চেয়ে বেশ এগিয়ে রয়েছে ফ্রান্স।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে দুই দল এখন পর্যন্ত মোট ৬টি ম্যাচে একে অপরের মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে ফরাসিরা জয় পেয়েছে ৪টি ম্যাচে। মরক্কো এখনো পর্যন্ত ফ্রান্সের বিপক্ষে কোনো জয়ের মুখ দেখেনি। দুই দলের মধ্যকার বাকি ২টি ম্যাচ ড্রয়ে শেষ হয়েছে।
চলতি বিশ্বকাপে কিলিয়ান এমবাপেদের ফ্রান্স টুর্নামেন্টের অন্যতম প্রধান ফেবারিট হিসেবে খেলছে। ফরাসিদের শক্তির জায়গা হলো তাদের গতি, স্কোয়াডের গভীরতা এবং বড় ম্যাচ জেতার অভিজ্ঞতা। অন্যদিকে মরক্কো এবারও তাদের লড়াকু মানসিকতা এবং দুর্দান্ত কাউন্টার-অ্যাটাকিং ফুটবল প্রদর্শন করছে। ব্রাহিম দিয়াজ ও আশরাফ হাকিমিদের নিয়ে গড়া মরক্কো দলটি কাউন্টার-অ্যাটাক এবং নিখুঁত ফিনিশিংয়ে দারুণ কার্যকারিতা দেখাচ্ছে, যা ফ্রান্সের ডিফেন্সের জন্য বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।
এদিকে ২০২৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে বড় ধাক্কা খেল মরক্কো। দলের অন্যতম প্রধান উইঙ্গার ইসমাইল সাইবারি মারাত্মক হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়েছেন।
এই ইনজুরির কারণে ফ্রান্সের বিপক্ষে হাইভোল্টেজ ম্যাচে তার অংশগ্রহণ নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। শেষ ষোলোর ম্যাচে কানাডার বিপক্ষে খেলতে গিয়ে হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পান সাইবারি। তীব্র ব্যথা অনুভব করায় ম্যাচ শেষ হওয়ার আগেই তাকে মাঠ ছাড়তে হয়। এরপর থেকেই তিনি চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।
যদিও মরক্কো ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এখনো সাইবারির ইনজুরির মাত্রা নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়নি, তবে স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তিনি গুরুতর হ্যামস্ট্রিং সমস্যায় ভুগছেন। ফলে ফ্রান্সের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে তার খেলা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সাইবারির সম্ভাব্য অনুপস্থিতি মরক্কোর জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে। আক্রমণভাগে তার গতি ও সৃজনশীলতা দলের অন্যতম শক্তি। তাই গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচের আগে তাকে দ্রুত সুস্থ করে তুলতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবি ও দলের চিকিৎসকরা। এখন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, ফ্রান্সের বিপক্ষে তিনি মাঠে নামতে পারবেন কি না।
ফিফা জানিয়েছে, বোস্টনে ফ্রান্স ও মরক্কোর মধ্যকার ম্যাচটি পরিচালনা করবেন আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞ রেফারি ফাকুন্দো তেলো। তার সহকারী হিসেবে থাকবেন হুয়ান পাবলো বেলাত্তি ও গাব্রিয়েল চাদে। চতুর্থ অফিশিয়াল দারিও হেরেরা এবং রিজার্ভ সহকারী রেফারির দায়িত্বে থাকবেন ক্রিস্টিয়ান নাভারো।
এবারের বিশ্বকাপে এই প্রথম কোনো ম্যাচে একই দেশের পাঁচজন অফিশিয়াল দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছেন। এমন প্রেক্ষাপটে কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের ম্যাচে আর্জেন্টাইন রেফারি নিয়োগ দেওয়া নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই এটিকে ফিফার পারস্পরিক ভারসাম্য রক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তবে এ বিষয়ে ফিফা কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেয়নি।
এদিকে মঙ্গলবার রাতে ষোলোতে আর্জেন্টিনা ও মিসর ম্যাচে রেফারির দায়িত্বে ছিলেন ফ্রান্সের ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে। সেই ম্যাচে রেফারির ভূমিকা নিয়ে আপত্তি তুলে ইতোমধ্যে ফিফায় অভিযোগ দিয়েছে মিসর। অন্যদিকে, ম্যাচের আগে ফরাসি রেফারি নিয়োগ দেওয়া নিয়ে আর্জেন্টিনার গণমাধ্যমও প্রশ্ন তুলেছিল। সেই বিতর্কের রেশ না কাটতেই ফ্রান্স ও মরক্কো ম্যাচের রেফারি প্যানেল ঘোষণা করল ফিফা।
তাই এই ম্যাচ ঘিরে ফুটবল বিশ্বে বাড়িয়ে দিয়েছে উত্তেজনা। মরক্কোর টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের শেষ আটে পৌঁছানোর কৃতিত্ব। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে চোটের কারণে অরেলিয়াঁ চুয়ামেনি ছাড়া খেলতে নামা ফ্রান্স দীর্ঘ সময় প্যারাগুয়ের সংগঠিত রক্ষণভাগ ভাঙতে ব্যর্থ হয়। তবে শেষ পর্যন্ত পেনাল্টির সুযোগ কাজে লাগিয়ে জয় নিশ্চিত করে দিদিয়ে দেশমের দল।
এই ম্যাচকে এবারের টুর্নামেন্টের অন্যতম আকর্ষণীয় লড়াই হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুই দলই দারুণ ফর্মে রয়েছে ফ্রান্স এখন পর্যন্ত প্রতিটি ম্যাচে একাধিকের বেশি গোল হজম করেনি, আর মরক্কো আন্তর্জাতিক ফুটবলে টানা ৩৪টি ম্যাচ অপরাজিত রয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ৬৫,৮৭৮ দর্শক উপস্থিতি থাকবে।
এক মাসব্যাপী রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের পর যে আসর শুরুর আগে আকাশছোঁয়া টিকিটের দাম ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নানা শঙ্কা ছিল- এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ এবং আয়োজনের দিক থেকে সবচেয়ে জটিল বিশ্বকাপটি শেষ পর্যন্ত আটটি দলে সীমাবদ্ধ হয়েছে। টুর্নামেন্ট জুড়ে দুর্দান্ত আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দিয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা ফ্রান্স এবার সম্ভবত তাদের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হবে। লেস ব্লুজরা দারুণ ছন্দে শেষ আটে পৌঁছেছে।
পাঁচ ম্যাচে তারা করেছে ১৪ গোল, যার মধ্যে সাতটিই এসেছে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপের পা থেকে। টুর্নামেন্ট শেষ পর্যায়ে পৌঁছানোর সাথে সাথে বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুট জয়ের লড়াইয়ে শীর্ষে থাকা চার তারকা স্ট্রাইকারের একজন এমবাপে।
কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবির অধীনে মরক্কো টেকনিক্যাল দক্ষতা, শারীরিক সামর্থ্য ও কৌশলগত বিচক্ষণতার সমন্বয়ে ফ্রান্সের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। গত বছর অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে মরক্কোর চমকপ্রদ শিরোপা জয়ের নেপথ্য কারিগরও ছিলেন ওয়াহবি।
ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশমও তার দল নিয়ে আশাবাদি। মোটের উপর এই ম্যাচটি ঘিরে সারা বিশ্বের ফুটবল দর্শকদের ভেতর উত্তেজনা আকাশচুম্বি।