বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সামনে এবার শেষ ষোলোয় নরওয়ে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে একাধিকবার মুখোমুখি হওয়া দলগুলোর মধ্যে নরওয়েই একমাত্র দল, যাদের বিপক্ষে আজও কোনো জয়ের দেখা পায়নি ব্রাজিল।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২ ম্যাচে ডালাসের এ টি অ্যান্ড টি স্টেডিয়ামে আইভরি কোস্টকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে নরওয়ে। আর তাতেই ব্রাজিলের সঙ্গে তাদের বহুল আলোচিত লড়াইও নিশ্চিত হয়েছে।
এর আগে জাপানকে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছিল ব্রাজিল। এবার কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে এমন এক প্রতিপক্ষের, যাদের বিপক্ষে ইতিহাস মোটেও সুখকর নয়।
এ পর্যন্ত ব্রাজিল ও নরওয়ে মুখোমুখি হয়েছে চারবার। এর মধ্যে নরওয়ে জিতেছে দুটি ম্যাচ এবং বাকি দুটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। ব্রাজিল এখনো নরওয়েকে হারাতে পারেনি।
বিশেষ করে ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে হারিয়ে নরওয়ের জয়টি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই স্মৃতি নিয়েই আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে মুখোমুখি হচ্ছে দুই দল। নরওয়েকে হারাতে পারলেই শেষ আটে অপেক্ষা করবে ইংল্যান্ড বা মেক্সিকো। আর্লিং হলান্ডের নেতৃত্বে নরওয়ে এবার বিশ্বকাপে নতুন ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন দেখছে। ইতিহাসও তাদের পক্ষেই কথা বলে।
১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে মারিও জাগালোর অধীনে রোনালদো, রিভালদো ও কাফুদের নিয়ে গড়া শক্তিশালী ব্রাজিলের বিপক্ষে তোরে আন্দ্রে ফ্লো ও শিতিল রেকদালের গোলে পুরো ম্যাচের চিত্রনাট্য বদলে দিয়ে ২-১ ব্যবধানের রোমাঞ্চকর জয় তুলে নেয় নরওয়ে।
এবারের বিশ্বকাপে সেই ইতিহাস বদলাতে পারবে কি না, তার উত্তর মিলবে ৬ জুলাইয়ের রাত দুটায় শেষ ষোলোর লড়াইয়ে। কাগজে-কলমে কার্লো আনচেলত্তির দলই এবার ফেভারিট হিসেবেই মাঠে নামবে। কিন্তু নিজেদের পঞ্চম প্রচেষ্টায় তারা কি পারবে নরওয়ের এই ‘অমীমাংসিত ধাঁধা’র সমাধান করতে?
মেক্সিকো সিটির প্রতিকূল আবহাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর সূচিতে কোনো পরিবর্তন আনছে না ফিফা। ফলে পূর্বনির্ধারিত সময়েই মাঠে গড়াবে মেক্সিকো-ইংল্যান্ড এবং ব্রাজিল-নরওয়ের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ।
গত কয়েকদিন ধরে ভারী বজ্রঝড়ের পূর্বাভাসের কারণে আজতেকা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য মেক্সিকো-ইংল্যান্ড ম্যাচের সময় এগিয়ে আনার আলোচনা চলছিল। সেই পরিবর্তন হলে একই দিনের অন্যান্য ম্যাচের সূচিতেও প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। বিশেষ করে ব্রাজিল-নরওয়ে ম্যাচের সময় নিয়েও তৈরি হয়েছিল নানা জল্পনা।
তবে সবদিক বিবেচনায় নিয়ে শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সূচিই বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। আবহাওয়ার পূর্বাভাস সামনে রেখে ফিফা, মেক্সিকান ফুটবল ফেডারেশন এবং ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের মধ্যে একাধিক দফা বৈঠক হয়।
সেখানে ম্যাচটি স্থানীয় সময় সন্ধ্যার বদলে দুপুর ১২টায় আয়োজনের প্রস্তাবও ওঠে। তবে দুই দলের ভ্রমণসূচি, সম্প্রচার পরিকল্পনা, স্টেডিয়াম ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য লজিস্টিক জটিলতার কারণে সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসে সংশ্লিষ্টরা।
আলোচনায় জননিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ম্যাচ দীর্ঘায়িত হলে গভীর রাতে বিপুলসংখ্যক দর্শকের নিরাপদে স্টেডিয়াম ত্যাগ নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে বলে উদ্বেগ ছিল স্থানীয় প্রশাসনের। অতীতে বিশ্বকাপ চলাকালে মেক্সিকোতে কয়েকটি ম্যাচকে ঘিরে উত্তেজনার ঘটনাও সেই উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এদিকে, বিশ্বকাপে মেক্সিকোর মাটিতে এটিই হবে শেষ ম্যাচ। এরপর টুর্নামেন্টের বাকি সব ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ভেন্যুতে। তাই স্বাগতিক সমর্থকদের জন্য ম্যাচটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। আবহাওয়ার শঙ্কা থাকলেও শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়েই খেলা আয়োজনের সিদ্ধান্তে সব ধরনের জল্পনার অবসান ঘটিয়েছে ফিফা। বিশ্বকাপজুড়ে চোট যেন ব্রাজিলের পিছু ছাড়ছে না।
একজন চোট কাটিয়ে ফিরছেন, তো নতুন করে আরেকজন ছিটকে যাচ্ছেন। চোট নিয়ে অস্বস্তির মধ্যেও রাউন্ড অব ১৬-এর ম্যাচের আগে কিছুটা স্বস্তির খবর পেয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচের আগে অনুশীলনে ফিরেছেন ব্রাজিল উইঙ্গার রাফিনিয়া। তবে নরওয়ের বিপক্ষে তিনি খেলবেন কি-না, তাও এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। গ্রুপপর্বে হাইতির বিপক্ষে ম্যাচ চলাকালীন পেশিতে চোট পান রাফিনিয়া। তার জায়গায় বদলি হিসেবে সুযোগ পান তরুণ উইঙ্গার রায়ান।
এরপর স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে এবং জাপানের বিপক্ষে শেষ বত্রিশের ম্যাচে শুরুর একাদশে খেলেন তিনি। দুই ম্যাচেই গতিময় ফুটবল, আক্রমণাত্মক প্রেসিং এবং ডান প্রান্তে প্রাণবন্ত পারফরম্যান্স দিয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন এই তরুণ। তবে রাফিনিয়া পুরোপুরি ফিট হয়ে মাঠে ফিরলে নরওয়ের বিপক্ষে আক্রমণভাগ নিয়ে ব্রাজিল নিশ্চিতভাবেই আরও বেশি স্বস্তিতে থাকবে। যদিও তার ম্যাচ খেলার সম্ভাবনা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। ব্রাজিলের চোটের লিস্ট অবশ্য আরও লম্বা।
জাপানের বিপক্ষে ব্রাজিলের শেষ ম্যাচে পেশিতে টান পেয়ে ছিটকে যান লুকাস পাকেতা। বিশ্বকাপে তার আর ফেরার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। পাকেতার অনুপস্থিতিতে দানিলো সান্তোসকে ব্রাজিলের শুরুর একাদশে দেখা যেতে পারে। এছাড়া চোট কাটিয়ে ফেরা নেইমারও মাঝমাঠে দেখা যেতে পারে।