বর্ষার পানিতে ভেজা কাদামাখা কৃষিজমি, ট্রাক্টরের গর্জন আর তার পেছনে ছোট জাল, প্লাস্টিকের পাত্র কিংবা খালি হাতে দেশীয় মাছ ধরতে ছুটে চলা শিশু—দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার পাল্টাপুর ইউনিয়নের কাজল গ্রামে যেন ফিরে এসেছে গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা এক চিরচেনা দৃশ্য। প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিকাজের এই সময়েও বর্ষার মাঠে দেশীয় মাছ ধরার আনন্দে মেতে উঠেছে গ্রামের শিশুরা।
শনিবার (৪ জুলাই) সকালে উপজেলার কাজল গ্রামের বিভিন্ন কৃষিজমিতে দেখা যায়, কৃষকেরা ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করছেন। চাষের সময় জমির নিচের কাদা উল্টে গেলে কই, শিং, মাগুর, টেংরা ও পুঁটিসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ ওপরে উঠে আসছে। আর সেই সুযোগে একদল শিশু ট্রাক্টরের পেছন পেছন দৌড়ে মাছ সংগ্রহ করছে।
সাম্প্রতিক টানা বৃষ্টিতে মাঠে পানি জমে থাকায় দেশীয় মাছের বিচরণ বেড়েছে। জমি চাষের সময় কাদার নিচে লুকিয়ে থাকা মাছ সহজেই ওপরে উঠে আসায় শিশুদের মধ্যে শুরু হয় মাছ ধরার আনন্দঘন প্রতিযোগিতা। কেউ হাতে, কেউ ছোট জাল দিয়ে, আবার কেউ প্লাস্টিকের পাত্রে মাছ জমিয়ে রাখছে। ধরা মাছের পরিমাণ খুব বেশি না হলেও তাদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আরিফ ইসলাম জানান, আগে বর্ষা মৌসুমে গরুর লাঙল দিয়ে জমি চাষের সময় শিশুদের মাছ ধরার দৃশ্য ছিল খুবই সাধারণ। এখন কৃষিকাজে ট্রাক্টরসহ আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়লেও বর্ষার মৌসুমে সেই ঐতিহ্যের কিছুটা রূপ এখনো টিকে আছে। তবে দেশীয় মাছের সংখ্যা আগের তুলনায় কমে যাওয়ায় এমন দৃশ্য এখন খুব একটা দেখা যায় না।
মাঠে মাছ ধরতে আসা শিশুদের কাছে এটি শুধু মাছ সংগ্রহের বিষয় নয়; বরং বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, প্রকৃতির সান্নিধ্য পাওয়া এবং গ্রামীণ জীবনের নির্মল আনন্দ উপভোগের একটি বিশেষ মুহূর্ত। কাদামাখা মাঠজুড়ে তাদের হাসি-আনন্দে প্রাণ ফিরে পায় পুরো পরিবেশ।
একদিকে কৃষকদের ব্যস্ত কৃষিকাজ, অন্যদিকে শিশুদের উচ্ছ্বাস—দুটি দৃশ্য মিলিয়ে কাজল গ্রামের মাঠে ফুটে ওঠে বাংলার গ্রামীণ জীবনের এক অনন্য ছবি। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কৃষিকাজের ধরন বদলালেও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং শৈশবের সহজ-সরল আনন্দ যে এখনো বেঁচে আছে, সেই বার্তাই দিচ্ছে এই দৃশ্য।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, দেশীয় মাছ ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ দেশীয় মাছ শুধু খাদ্যের উৎস নয়, গ্রামীণ ঐতিহ্য, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্ষার মাঠে শিশুদের এমন প্রাণবন্ত উপস্থিতি নতুন প্রজন্মকে প্রকৃতি ও গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এক অনন্য সুযোগ করে দিচ্ছে।