জরাজীর্ণ কুঁড়েঘরে মা-মেয়ের মানবেতর জীবন

এম এ রাজা, হবিগঞ্জ

সারাদেশ

‘আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।’কবি জসীম উদ্দীনের সেই বিখ্যাত কবিতার আসমানীর মতোই যেন আজও বাংলাদেশের

2026-07-02T12:30:55+00:00
2026-07-02T12:30:55+00:00
  রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬,
২১ আষাঢ় ১৪৩৩
 
রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
বৃষ্টিতে ভিজে কাটে রাত
জরাজীর্ণ কুঁড়েঘরে মা-মেয়ের মানবেতর জীবন
এম এ রাজা, হবিগঞ্জ
বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬, ১২:৩০ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
‘আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,
রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।’ 

কবি জসীম উদ্দীনের সেই বিখ্যাত কবিতার আসমানীর মতোই যেন আজও বাংলাদেশের প্রত্যন্ত জনপদে বেঁচে আছেন অসংখ্য তৃপ্তি ব্রহ্মচারী। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তাদের ভাগ্যে জোটেনি মাথা গোঁজার মতো একটি নিরাপদ আশ্রয়।

হবিগঞ্জ সদর উপজেলার ৪ নম্বর পৈল ইউনিয়নের পশ্চিমপাড়া ব্রাহ্মণপাড়ায় গেলে চোখে পড়ে হৃদয়বিদারক এক দৃশ্য। একটি জরাজীর্ণ কুঁড়েঘরে ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তৃপ্তি ব্রহ্মচারী। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, সামান্য ঝড় কিংবা প্রবল বৃষ্টিতেই বুঝি ভেঙে পড়বে পুরো ঘরটি।

ঘর বলতে বাঁশের খুঁটি, মরিচা ধরা টিন, ছেঁড়া পলিথিন আর পুরোনো কাপড় দিয়ে কোনো রকমে দাঁড়িয়ে থাকা একটি আশ্রয়। টিনের চালজুড়ে অসংখ্য ছিদ্র। একটু বৃষ্টি শুরু হলেই ফোঁটা ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে ঘরের প্রতিটি কোণে। তখন আর ঘর বলে কিছু থাকে না পুরো ঘরটাই যেন বৃষ্টির পানিতে ভিজে একাকার হয়ে যায়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঘরের মেঝে কাদায় ভরা। বিছানা, বালিশ, কাপড়-চোপড়, চাল-ডাল সবই ভিজে যায় বৃষ্টির পানিতে। শুকনো কোনো জায়গা খুঁজে পাওয়া যায় না। এক কোণ থেকে আরেক কোণে ছুটে বেড়ান তৃপ্তি ব্রহ্মচারী। কখনও নিজের কাপড় দিয়ে, কখনও পুরোনো প্লাস্টিক দিয়ে পানি ঠেকানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে সেই লড়াইয়ে প্রতিবারই হার মানতে হয় তাকে।

ঝড় উঠলেই আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। বুকের সঙ্গে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে সারারাত নির্ঘুম কাটান তিনি। ভয় একটাই এই বুঝি ভেঙে পড়ল মাথার ওপরের শেষ আশ্রয়টুকু।

অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তৃপ্তি ব্রহ্মচারী বলেন, বৃষ্টি শুরু হলেই ঘুম আসে না। সারারাত মেয়েকে কোলে নিয়ে বসে থাকতে হয়। বিছানা ভিজে যায়, কাপড় ভিজে যায়। কোথাও শুকনো জায়গা থাকে না। ঝড় এলে মনে হয়, আজ বুঝি ঘরটা ভেঙেই পড়বে। তখন শুধু আল্লাহর কাছে দোয়া করি যেন মেয়েটাকে নিয়ে বেঁচে থাকতে পারি।

জীবনযুদ্ধও যেন তার জন্য থেমে নেই। দিনমজুরি আর মানুষের দয়ায়-দাক্ষিণ্যে কোনোরকমে চলে সংসার। প্রতিদিন কাজ জোটে না। অনেক দিন দুবেলা খাবারও জোটে না মা-মেয়ের। ঘর মেরামত করা তো দূরের কথা, প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাই যেখানে কঠিন, সেখানে নতুন একটি ঘরের স্বপ্ন যেন বিলাসিতা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন তৃপ্তি ব্রহ্মচারী। এলাকার অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে সাহায্য করেছেন। কেউ চাল দিয়েছেন, কেউ কাপড়, কেউবা সামান্য কিছু অর্থ। কিন্তু এসব সহায়তা সাময়িক হলেও তার স্থায়ী সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। একটি নিরাপদ ঘর ছাড়া এই পরিবারটির দুর্ভোগ শেষ হওয়ার নয়।

স্থানীয়দের মতে, সরকারি আশ্রয়ন প্রকল্প, সমাজসেবা অধিদপ্তর কিংবা কোনো মানবিক সংগঠন এগিয়ে এলে মা-মেয়ের জীবন বদলে যেতে পারে। একটি ছোট্ট পাকা ঘরই ফিরিয়ে দিতে পারে তাদের নিরাপত্তা, স্বস্তি এবং নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন।

এলাকাবাসীর প্রশ্ন, স্বাধীনতার এত বছর পরও যদি একজন মা ও তার ছোট্ট সন্তান নিরাপদ একটি ঘর না পান, তাহলে উন্নয়নের সুফল তাদের জীবনে কতটা পৌঁছেছে?

একটি নিরাপদ আশ্রয়, দুবেলা খাবার, মেয়েটির লেখাপড়ার সুযোগ এবং সমাজের একটু আন্তরিক সহমর্মিতা এগুলোই এখন তৃপ্তি ব্রহ্মচারীর সবচেয়ে বড় চাওয়া।

সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং মানবিক মানুষের প্রতি আবেদন আসুন, যার যতটুকু সামর্থ্য আছে, এই অসহায় মা ও মেয়ের পাশে দাঁড়াই। কারণ একটি ছোট্ট সহায়তাই হয়তো বদলে দিতে পারে দুটি মানুষের পুরো জীবন।

মানুষ মানুষের জন্য এই বিশ্বাসটুকুই আজ তৃপ্তি ব্রহ্মচারী ও তার ছোট্ট মেয়ের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।


  বিষয়:   তৃপ্তি ব্রহ্মচারী 


Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: