শিক্ষায় বরাদ্দকৃত ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার ২১টি বড় মেগাপ্রকল্পের মাধ্যমে সারা দেশে ব্যাপক পরিবর্তন আসছে। ক্যাডেট স্কুল-কলেজের আদলে সারা দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনে নতুন করে ৬০০ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে চায় সরকার।
এসব প্রতিষ্ঠানে থাকবে শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যাধুনিক আবাসিক হল, এআই ল্যাব ও প্রযুক্তিনির্ভর ক্লাসরুম। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ল্যাব স্থাপনের এই উদ্যোগ শিক্ষার মানোন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে চাচ্ছে সরকার। প্রতি ক্লাসে ভর্তি করা হবে মাত্র ৫০ জন শিক্ষার্থী।
এ জন্য ‘বাংলাদেশের নির্বাচিত এলাকাগুলোতে ৬০০ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ নির্মাণ প্রকল্প’ নামে ৬৮ হাজার ৪৪২ কোটি টাকার মেগাপ্রকল্প হাতে নিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। ২০৩১ সালের জুনের মধ্যে এসব প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
শুধু এসব প্রকল্পই নয়, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রযুক্তি ল্যাব স্থাপন প্রকল্প, বৃহৎ জেলা শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গণপরিবহনভিত্তিক যাতায়াত ব্যবস্থা প্রকল্প, দুর্গম এলাকায় ঝরে পড়া রোধে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সম্প্রসারণ প্রকল্পসহ সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে আরও ১৫টি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এর বাইরে সেকেন্ডারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (এসইডিপি) আরও ১১ হাজার ৬৩৪ কোটি ব্যয়ে ১১টি নতুন স্কিম হাতে নিয়েছে। এরই মধ্যে এসব প্রকল্প ও স্কিমের সারসংক্ষেপ প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত এসব প্রকল্প ও স্কিম অনুমোদনের জন্য শিগগির মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। অনুমোদন সাপেক্ষে নতুন অর্থবছরে অনেক প্রকল্প ও স্কিমের কাজ শুরু হবে বলে আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন, সরকারের অগ্রাধিকারের শীর্ষে রয়েছে শিক্ষা খাত। প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার প্রস্তাবিত প্রকল্প ও স্কিমগুলো বাস্তবায়ন হলে শিক্ষায় আমূল পরিবর্তন আসবে। তবে শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু প্রকল্প নিলেই হবে না, সঠিক সময়ে বাস্তবায়নের দিকেও নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা খাতের মূল সমস্যাগুলোর দিকে নজর ও সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলেই স্বপ্নের শিক্ষা খাত গড়ে উঠবে।
মাউশি সূত্র জানায়, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার ও শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী মাউশির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার আন্তঃমন্ত্রণালয় প্রোগ্রামিং কমিটি নতুন ৩৬টি প্রকল্পের সার-সংক্ষেপ ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রস্তাব প্রস্তুত করেছে। এর মধ্যে ২১টি প্রকল্প আর বাকি ১৫টি সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্প। প্রকল্পগুলো অনুমোদনের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
মাউশির নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, মাউশির প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে আনুমানিক দেড় লাখ কোটি টাকা ব্যায় হবে। আর এসইডিপির বরাদ্দের সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা সম্ভব হয়নি। সে টাকা থেকে নতুন স্কিম নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো অনুমোদন পেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কয়েকটি প্রকল্প নতুন অর্থবছরেই শুরু হবে।
এ তালিকায় রয়েছে-শিক্ষাক্রম ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা পরিমার্জন ও উন্নয়ন প্রকল্প, বাংলাদেশের নির্বাচিত এলাকায় ৬০০টি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ নির্মাণ প্রকল্প, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নকল্পে প্রযুক্তি ল্যাব স্থাপন প্রকল্প, ৩২টি বৃহৎ জেলায় উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন প্রকল্প, সব বিদ্যালয়ে গ্রিন অ্যান্ড রিনিউঅ্যাবল এনার্জি ও রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং প্রকল্প, বৃহৎ জেলা শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গণপরিবহনভিত্তিক যাতায়াত ব্যবস্থা প্রকল্প ও মাউশি অধিদপ্তরের ইএমআইএস সেল শক্তিশালীকরণ প্রকল্প।
অননুমোদিত প্রকল্পের জন্য নতুন অর্থবছরে প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। সেখান থেকেও বরাদ্দ দেওয়া যাবে। মাউশির বর্তমান মহাপরিচালক প্রকল্পগুলোর বিষয়ে খুবই আন্তরিক। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যক্রম শুরু হবে।
সার্বিক বিষয়ে মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হলে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষাক্ষেত্রে ৪৩টি বিষয় বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তার মধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ৬ মাসে আমরা ২৯টি বিষয় বাস্তবায়ন করতে চাই। সেই বিষয়গুলোকে টার্গেট করেই এসব প্রকল্প ও স্কিম হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে যেগুলো মন্ত্রণালয় অনুমোদন দেবে, তা দ্রুত বাস্তবায়ন শুরু হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষার আধুনিকায় ও নতুন দিগন্ত উন্মোচনে মাউশ কর্তৃক প্রকল্পগুলো মাত্র প্রস্তাব করা হয়েছে। কোনোটিই এখনো চূড়ান্ত হয়নি। মন্ত্রণালয় আরও যাচাই-বাছাই করে যেসব প্রকল্পের যৌক্তিকতা রয়েছে; সেগুলো অনুমোদন দেবে। তবে এর মধ্যে সিংহভাগ প্রকল্পই অনুমোদন হতে পারে পারে। আর অনেক প্রকল্প নতুন অর্থবছরেই আসবে এটাও নিশ্চিত।
এ বিষয়ে রাজধানীর একটি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ বলেন, ৬০০টি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ নির্মাণ প্রকল্প, এটি সবচেয়ে বড় প্রকল্প হলেও প্রশ্ন হলো- দেশে এরই মধ্যে সরকারি, বেসরকারি, ক্যাডেট, স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও মডেল স্কুল রয়েছে। নতুন ৬০০টি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিবর্তে বিদ্যমান দুর্বল বিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়নে একই অর্থ ব্যয় করলে বেশি সুফল মিলতে পারে। এত প্রতিষ্ঠান থাকতে নতুন প্রতিষ্ঠান কেন করতে হবে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় আদৌ পরিবর্তন আনতে হলে সবার আগে শিক্ষার্থী, যোগ্য শিক্ষক ও যুগোপযোগী কারিকুলাম লাগবে।
একটি ভালো কারিকুলাম তৈরি করা যতটা জরুরি, তার থেকে সঠিক বাস্তবায়ন আরও বেশি জরুরি। তবে সরকার শিক্ষার উন্নয়নে নানা প্রকল্প হাতে নেবে এটা স্বাভাবিক। তবে প্রকল্পের সঙ্গে সরকারের লক্ষ্যের যোগসূত্র থাকতে হবে। অনেক গবেষণা ও যাচাই-বাছাই করে প্রকল্পগুলো নিতে হবে। কেনো প্রকল্প নেওয়া হবে, তার ফল কী আসবে, তা সঠিকভাবে বের করতে হবে। তা করতে না পারলে প্রকল্পগুলোর ভালো ফল আসবে না। শুধু অর্থের অপচয় হবে।