জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবসহ মানবসৃষ্ট নানা কারণে দেশে কমছে ইলিশের ডিম ছাড়ার পরিমাণ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে গবেষকরা নতুন উদ্বেগের কথা বলছেন। নদীতে আগের মতো সব মা ইলিশ ডিম ছাড়তে পারছে না। অনেক এলাকায় ডিম ছাড়ার পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। জাটকার বেঁচে থাকার হারও নানা কারণে কমছে। এর প্রভাব ধীরে ধীরে উৎপাদনের ওপর পড়তে শুরু করেছে। ফলে বাজারে চাহিদার তুলনায় ইলিশের সরবরাহ সীমিত থাকছে। দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) ইলিশ গবেষণা কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, ইলিশের ডিম ছাড়ার পরিমাণ ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ৯৩ হাজার ২৫৮ কেজি কমেছে। একই সময়ে ডিম ফুটে রেনু পোনা হওয়া কমেছে ৪৬ হাজার ৬১৯ কেজি। পাশাপাশি ইলিশ মাছ (জাটকা) বাঁচার পরিমাণ কমেছে ৪ হাজার ৬৬২ কোটি। এ সময়ে ইলিশ উৎপাদন হয়েছে ২৪ সালে ৫.২৯ লাখ টন। সেই বাবে ২৫ মালে তা এসেছে ৫ লাখ টনে। এখানে উল্লেখ্য যে, সরকারিভাবে উৎপাদন ধরা হয় অর্থ বছর হিসেবে আর ডিম ছাড়ার পরিমাণ নির্ধারণ হয় বছর ভিত্তিক।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানাগেছে, পদ্মা ও মেঘনার মোহনায় ইলিশের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য উদ্ভিদকণা (জুপ্ল্যাংকটন) ও ১২ প্রজাতির প্রাণিকণা (ফাইটোপ্ল্যাংটন)আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসছে। যার প্রভাব পড়ছে ইলিশের আকৃতিতেও।
গবেষণার মাধ্যমে দেখা গেছে, ইলিশের ডিমের অর্ধেক যদি নিষিক্ত হয় এবং তার মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ বেঁচে থাকে, তাহলে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি পোনা ইলিশ জন্ম নিতে পারে। ইলিশের ডিম পাড়ার মৌসুম শেষ হলেও ছোট ইলিশের বৃদ্ধি হওয়ার জন্য কিছু সময় থাকে। তাই জাটকা ধরা দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখলে ইলিশ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। মা-ইলিশকে রক্ষা করলে তারা ডিম পাড়ার সুযোগ পায় এবং সেই ডিম থেকে জন্ম নেয়া জাটকা পরবর্তীতে বড় ইলিশে পরিণত হয়। একটি মা-ইলিশ সাধারণত চার থেকে পাঁচ লাখ ডিম দেয়।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) ইলিশ গবেষণা কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে ইলিশের ডিম উৎপাদনের পরিমাণ বাড়লেও এধারা টানা ১০ বছর অব্যাহত ছিল।
২০১৫ সালে ডিম ছাড়ার পরিমান ছিল৫ লাখ ৯৯ হাজার ৭২০ কেজি বা ডিম ফোটার পরিমান চিল ২লাখ ৯৯ হাজার ৪৬০ কেজি, এসমওয় জাটকা হয়েছিল ২৯ হাজার ৯৮৬ কোটি। যা ২০২৪ সালে উন্নতি হতে হতে ডিম ছাড়ার পরিমাণ ৮ লাখ ৮৪ হাজার ৮০২ কেজিতে পৌছেছে। এসময়ে উৎপাদন প্রায় দ্বিগুন ৪৪ হাজার ২৪০ কোটিতে পৌছেছে। কিন্তু হঠাৎ করেই ২০২৫ সালে এসে ডিম ছাড়া, ডিম ফোটা এবং জাটকায় পরিণত হওয়া কমেগেছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে রেকর্ড ৫ লাখ ৭১ হাজার টনের বেশি ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট ইলিশ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টন।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এর আগের অর্থবছরে ২০২২-২৩ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন, যার ফলে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ প্রায় ৪২ হাজার টন কমে যায়।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে ইলিশের মোট উৎপাদন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ মেট্রিক টন, যা আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ১২ শতাংশ কম। ২০২৫ -২০২৬ অর্থ বছরে ইলিশের উৎপাদন ৫ লাখ টনের নিচে নেমে আসতে পারে। বিএফআরআই শঙ্কা করছে, ২০২৬ সালে ইলিশ মাছের ডিম ছাড়ার পরিমাণ আরো কমে আসতে পারে।
বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, বৃষ্টিপাতের ধরন, নদীর প্রবাহ, পানির তাপমাত্রা এবং লবণাক্ততার পরিবর্তন ইলিশের প্রজনন আচরণকে প্রভাবিত করছে। অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে নদীতে পর্যাপ্ত পানি থাকে না। আবার কোথাও অতিরিক্ত স্রোত সৃষ্টি হয়। এতে ডিম ছাড়ার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হয়।
অতিরিক্ত ও বেআইনি আহরণ, ইলিশের অভয়াশ্রম ও প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস হওয়া, কারেন্ট জাল ব্যবহার, নদীতে চর, দূষণসহ সাগরে মৎস্য আহরণের নিষিদ্ধ সময়ের ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ ব্যবধানের কারণে এমনটি ঘটে থাকতে পারে। অবশ্য তারা বলছেন, প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়ে দেশে আবারো ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
মৎস্য অধিদপ্তর বলছে জলবায়ু পরিবর্তন, বেআইনি মৎস্য আহরণ, ইলিশের অভয়াশ্রম ও প্রজনন স্থান নষ্ট, জেলি ফিশ বেড়ে যাওয়া, বিগত সময়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে মৎস্য আহরণের নিষিদ্ধ সময়ের মধ্যে দীর্ঘ ব্যবধান, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও দূষণের কথা।
পাশাপাশি তারা ইলিশের জেনেটিক্যাল পরিবর্তন ঘটে থাকতে পারে বলেও ধারণা করছে।
কেননা গত কয়েক বছরে আহরিত মাছের গড় দৈর্ঘ্য কমে এসেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। অর্থাৎ আগের তুলনায় ইলিশের আকার ছোট হয়েছে। আকার ছোট হওয়ায় ইলিশের মোট ওজনেও তার প্রভাব পড়েছে।
চাঁদপুর নদী কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. তায়েফা আহমেদ বলেন, ইলিশের প্রজনন সুরক্ষা, জাটকা সংরক্ষণ এবং সামগ্রিক উৎপাদন বৃদ্ধিতে গণসচেতনতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর জোর দিতে হবে। ইলিশসম্পদ রক্ষার জন্য সরকারি নির্দেশনার পাশাপাশি সামাজিক শৃঙ্খলা ও জেলেদের বিকল্প আয়ের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) মহাপরিচালক অনুরাধা ভদ্র বলেন, বর্তমানে ফিশিং প্রেসার বেশি।নানা কারণে ইলিশের ডিম ছাড়ার পরিমাণ, ডিম ফোঁটা এবং জাটকায় পরিনত হওয়ার হার কমছে।
ছোট মাছের ডিম পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নানা কারণে যেসব ইলিশ সমুদ্রে যেতে পারে না সেসব ইলিশের ১৫০-২৫০ গ্রামের মাছ পাওয়া যায়। সম্প্রতি দেশের ভোলা, বরিশালসহ বিভিন্ন জায়গায় এ চিত্র দেখা গেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, আমরা যাকে ছোট বলছি। আর এসব মাছের পেট ডিম ওরয়েছে। কিন্তু এসব মাছের বয়স ২ বছরের বেশি। বয়স হলেও বড় হয়নি।
তিনি আরো বলেন, ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধিতে মাইগ্রেশন রুটের ডুবচর গুলো অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া , নতুন অভয়াশ্রম ঘোষণার জন্য গবেসষণা জোরদার করা, জেলেদের মাছ ধরা নিষিদ্ধকালীন বিকল্প আয়োর জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। এছাড়াও নদী কেন্ত্রিক কার্যক্রম, সমুদ্রে আরো গবেষণা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহা. ইয়ামিন হোসেন বলেন, ইলিশ কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে। নাব্য কমায় প্রজনন মৌসুমে নদীগুলোতে একেবারেই স্রোত থাকে না। ফলে সাগর থেকে নদীতে চলাচলের পথে বাধা তৈরি হয়। জাটকা ও মা-ইলিশ আহরণ বন্ধে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারার বিষয়টিও রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে উৎপাদন কমার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ইলিশ বাঁচে পাঁচ বছর। নদীতে প্রচুর পরিমানে মাছ ধরার কারণে নদীতে বড় ইলিশ কমে গেছে।
এ কারণে এখন যেসব মাছ পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো বিগত পাঁচ-ছয় বছরের তুলনায় অনেকটাই ছোট। পাঁচ বছর পরপর ইলিশের সার্কেল পরিবর্তন হয়। ২০২৭-এর শেষে এবং ২০২৮ সালে গিয়ে উৎপাদন বাড়তে পারে।’
ইলিশসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প প্রকল্পটির পরিচালক (পিডি) মোল্লা এমদাদুল্যাহ বলেন, প্রাকৃতিক উৎসের সব মাছেরই উৎপাদন কমছে। নদীতে পানি নেই। মাছ কীভাবে আসবে? মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীতেই আড়াইশর বেশি চর তৈরি হয়েছে। সাগর থেকে নদীতে আসা কিংবা নদী থেকে সাগরে ফিরে যাওয়ার পথে বাধা তৈরি হয়েছে। ফলে ইলিশ ডিম ছাড়ার মৌসুমে নদীতে আসতে পারছে না। গত কয়েক বছরে জেলের সংখ্যা বেড়েছে। একই পরিবারে ৩/৪জন জেলে রয়েছে।
ইলিশের মাইগ্রেশনের পথ, প্রজননক্ষেত্র ও নার্সারি গ্রাউন্ড নষ্ট হচ্ছে। আহরিত ইলিশের গ্রোথ কমছে। পাঁচ বছর আগেও আহরণ করা ইলিশের গড় ওজন ছিল ৫০০-৫৫০ গ্রাম। এখন সেটি ৩০০-৩৫০ গ্রামে নেমে এসেছে। এর মূল কারণ বাচ্চা ইলিশ সাগরে যেতে পারছে না। ডুবোচর কিংবা অতিরিক্ত শিকারের কারণে এসব ইলিশ সাগরে যেতে পারছে না। আর সাগরে যেতে না পারলে ইলিশের বৃদ্ধি কমে যায়।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেছেন, ইলিশ মাছের উৎপাদন ও সংরক্ষণে প্রতিবন্ধক হিসেবে বিভিন্ন ধরণের জাল। যা ব্যবহার করে জেলেরা ইলিশসহ বিভিন্ন ধরণের মৎস্য শিকার করছে। এধরণের ক্ষতিকর জাল উৎপাদন বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মুন্সিগঞ্জের বিভিন্ন জায়গায় জাল তৈরির কারখানা রয়েছে। মৎস্য ধরা বন্ধের সময় জেলেদের জাল ধরা হয়। কিন্তু এসব ক্ষতিকর জাল যাতে উৎপাদন না হয়, সেজন্য অভিযান পরিচালনা দরকার।
মৎস্য প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, এই সেক্টরে ৪০ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে জড়িত। বিভিন্ন সময়ে মৎস্যসম্পদ রক্ষায় মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়।
ইলিশের মাইগ্রেটরি রুট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, খাল কাটার সঙ্গে মৎস্যসম্পদ জড়িত। এ থেকেই শহীদ জিয়াউর রহমান খাল খনন শুরু করেছিলেন। বর্তমান সরকারও এ বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছে। জেলেরাও কৃষি কার্ডের আওতায় আসছে।