শরীয়াহভিত্তিক পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকে আমানত রাখা গ্রাহকদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং দ্রুত আমানত ফেরতের দাবিতে চট্টগ্রামে বিক্ষোভ মিছিল ও স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি পালন করেছেন ভুক্তভোগী আমানতকারীরা।
সোমবার (২৯ জুন) সকালে ‘সম্মিলিত পাঁচ ইসলামিক ব্যাংক ডিপোজিটরস অ্যাসোসিয়েশনের’ ব্যানারে শতাধিক আমানতকারী নগরের নিউ মার্কেট মোড়ে সমবেত হন। পরে সেখান থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের সামনে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে অবস্থান নিয়ে তারা বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ করেন এবং পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধানের কাছে স্মারকলিপি দেন।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারী সাইদুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে গড়ে তোলা সঞ্চয়, পেনশন এবং জমি বিক্রির টাকা পরিবারের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ব্যাংকে জমা রেখেছিলাম। কিন্তু আজ সেই আমানত ফেরত না পেয়ে আমরা চরম অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সংকটে পড়েছি। মুনাফা তো দূরের কথা, জমা রাখা মূল টাকাটাও পাচ্ছি না। এখন সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচটি ব্যাংকের আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা, বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার এবং স্বাভাবিক ব্যাংকিং লেনদেন চালুর দাবিতেই তারা আন্দোলন করছেন।
বেলা ১১টার দিকে নিউ মার্কেট মোড়ে অবস্থান নিয়ে পরে মিছিলসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল ফটকের সামনে যান আমানতকারীরা। এ সময় তারা ‘হই হই রই রই, আমানতের টাকা গেল কই’, ‘আমার টাকা ব্যাংকে, আমি কেন রাস্তায়’ এবং ‘হেয়ার কাট মানি না, মানব না’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।
বিক্ষোভকারীরা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আমানতের ওপর গত দুই বছরের মুনাফা কর্তন এবং মাত্র ৪ শতাংশ বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্তে প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রায় দুই বছর ধরে স্বাভাবিকভাবে আমানত উত্তোলন করতে না পারায় তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। অনেকেই চিকিৎসা, শিক্ষা এবং দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করতে পারছেন না।
এক্সিম ব্যাংকের আমানতকারী নাজিয়া হক বলেন, ব্যাংকে আমানত রাখা কোনো বিনিয়োগের ঝুঁকি নয়, এটি একজন নাগরিকের নিরাপত্তার বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস নিয়েই আমরা আমাদের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যাংকে জমা রেখেছিলাম। কিন্তু এখন চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা, সংসারের ব্যয়—কোনো প্রয়োজনেই সেই অর্থ ব্যবহার করতে পারছি না। আমরা কোনো বিশেষ সুবিধা চাই না, শুধু আমাদের ন্যায্য আমানত ও মুনাফা ফেরত চাই।
বিক্ষোভে আমানতকারীরা ‘হেয়ার কাট’ নীতি বাতিল করে চুক্তি অনুযায়ী মুনাফাসহ মূল আমানত ফেরত, সব ব্যাংকে স্বাভাবিক লেনদেন চালু, তারল্য সংকট মোকাবিলায় বিশেষ সহায়তা, মেয়াদোত্তীর্ণ এফডিআর, ডিপিএস ও এমটিডিআরের অর্থ চুক্তি অনুযায়ী পরিশোধ এবং আগের মুনাফার হার বহাল রাখার দাবি জানান।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি শারমিন আক্তার বলেন, আমরা আমাদের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সবার কাছে স্মারকলিপি পাঠিয়েছি। আমরা আমাদের ন্যায্য অর্থ ফেরতের দাবিতে আন্দোলন করছি। দ্রুত সমাধান না হলে কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হব।
পরে সংগঠনের ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করে দাবিসংবলিত স্মারকলিপি হস্তান্তর করেন।
স্মারকলিপিতে তিনটি প্রধান দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো— কথিত ‘হেয়ার কাট’ বা আমানত থেকে অর্থ কর্তনের প্রক্রিয়া অবিলম্বে বাতিল, ব্যাংকিং কার্যক্রম দ্রুত স্বাভাবিক করা এবং আমানতকারীদের জমাকৃত অর্থের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান প্রতিনিধি দলের বক্তব্য শোনেন এবং স্মারকলিপি গ্রহণ করেন। তিনি জানান, বিষয়টি দ্রুত বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে পাঠানো হবে এবং সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা হবে।
বৈঠক শেষে প্রতিনিধি দল নিউ মার্কেট মোড়ে ফিরে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন। এতে বক্তব্য দেন সংগঠনের সভাপতি মু. আবুল কালাম আজাদ, সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেন, সিনিয়র সহসভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম, অর্থ সম্পাদক আলাউদ্দিন আজাদ এবং সহসভাপতি শারমিন আক্তার।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে তাদের ন্যায্য দাবিগুলো তুলে ধরা হয়েছে। তবে দ্রুত কার্যকর সমাধান না এলে ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর ও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
উল্লেখ্য, একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের আমানতকারীরা দীর্ঘদিন ধরে ‘হেয়ার কাট’ নীতি বাতিল এবং স্বাভাবিক ব্যাংকিং লেনদেন চালুর দাবিতে আন্দোলন করছেন। তাদের দাবি, এসব ব্যাংকে প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারীর মোট ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে।