চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় পল্লী বিদ্যুতের অস্বাভাবিক ও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজারো গ্রাহক। স্থানীয়দের ভাষায় ‘ভূতুড়ে বিল’ আতঙ্কে নাভিশ্বাস উঠছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর। চলতি মাসে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বিল পাওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিদ্যুতের ব্যবহার গত মাসের তুলনায় কম বা সমান থাকলেও হঠাৎ করেই বিলে কয়েক গুণ টাকা বাড়ানো হয়েছে। কারও কারও বিল দ্বিগুণের বেশি, আবার কারও ক্ষেত্রে তিনগুণেরও বেশি এসেছে।
উপজেলার এওচিয়া ইউনিয়নের গ্রাহক আবদুল মাবুদ জানান, গত মাসে তার বাড়িতে বিল এসেছিল ৫৬৮ টাকা। কিন্তু চলতি মাসে ২ হাজার ৬৫৫ টাকার বিল হাতে পেয়ে তিনি অবাক হন। তিনি বলেন, ব্যবহার একই রকম, অথচ বিল এত বেশি হওয়ার কোনো কারণ নেই। পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে গিয়েও কোনো সমাধান মেলেনি।
আমিলাইশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মফিজুর রহমান জানান, গত মাসে তার বিল ছিল ৭০০ টাকা। এই মাসে তা ১ হাজার ৮৩২ টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা গতবারের তুলনায় আড়াই গুণেরও বেশি। আহমদ ছফা নামে আরেক ভুক্তভোগী বলেন, গত মাসে বিল ছিল ৭৫২ টাকা, এবার তা ২ হাজার ৫৯০ টাকা। সংসারের নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে এমনিতেই হিমশিম খাচ্ছি, এর ওপর এই বাড়তি বিল গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এওচিয়া ইউনিয়নের ওয়াহিদারপাড়া ইসলামী তরুণ সংঘের সভাপতি আহমদ কবির জানান, তার গত মাসের তুলনায় চলতি মাসে দ্বিগুণ বিল এসেছে। তিনি বলেন, মাসে যেখানে এক থেকে দুই হাজার টাকার বিল পরিশোধ করি, সেখানে হঠাৎ এই অস্বাভাবিক অঙ্ক অযৌক্তিক।
কাঞ্চনা এলাকার প্রবাসী ফরহান উদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, বিল সংশোধনের জন্য আবেদন নিয়ে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। অনেক সময় অভিযোগ গ্রহণ করা হলেও দ্রুত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ফলে একদিকে অতিরিক্ত বিলের চাপ, অন্যদিকে অফিসে যাতায়াত—দুই দিক থেকেই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ গ্রাহকরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাতকানিয়া পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের ডিজিএম (জেনারেল ম্যানেজার) মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী জানান, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। তিনি বলেন, সারা বাংলাদেশে ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি রয়েছে। সব জায়গাতেই এ মাসে বিল বেশি আসার খবর পাওয়া গেছে। তবে বিল বেশি আসার কারণ হলো এ মাসে লোডশেডিং কিছুটা বেশি ছিল, তার মধ্যে বিদ্যুৎ ব্যবহার রিডিং বিল বাড়ানো হয়েছে—এ কারণেই বিদ্যুৎ বিল বেশি আসতে পারে।
অতিরিক্ত বিলের বিষয়ে কোনো প্রতিকার মিলছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, যদি কোনো গ্রাহক মনে করেন তার বিল অস্বাভাবিক হয়েছে, তবে তিনি নির্দিষ্ট ফরমে অভিযোগ জমা দিতে পারবেন। অভিযোগের ভিত্তিতে টিম সরজমিনে মিটার চেক করে ব্যবস্থা নেবে। প্রকৃত ভুল প্রমাণিত হলে বিল সংশোধনের নিয়ম রয়েছে।
চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী নূর মোহাম্মদ বলেন, মিটার রিডিং ও কোরবানির সময় বিদ্যুৎ ব্যবহার বৃদ্ধি—এই দুই কারণে বিল বেশি আসতে পারে। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। কোনো গ্রাহকের বিলে অসংগতি থাকলে দপ্তরে অভিযোগ করলে তদন্তসাপেক্ষে দ্রুত তা সংশোধন করা হবে। গ্রাহক হয়রানি রোধে আমরা সব সময় তৎপর।
ভুক্তভোগী গ্রাহকরা মনে করছেন, করোনাকালীন সময়ের মতো এখনো যদি প্রতিটি মিটার রিডিং গ্রাহকের উপস্থিতিতে নেওয়া হতো, তবে এই অরাজকতা তৈরি হতো না। তারা দ্রুত এই ‘ভূতুড়ে বিল’ সংশোধন করে মিটার রিডিং অনুযায়ী প্রকৃত বিল প্রদানের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে এ ধরনের বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পেতে স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন উপজেলার সচেতন মহল।