মৃত বেড়ে ৯২০, উদ্ধারকাজে ধীরগতিতে অসন্তোষ বাড়ছে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

জোড়া ভয়াবহ ভূমিকম্পের ভেনেজুয়েলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯২০ জনে। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও বহু মানুষ আটকা পড়ে থাকায় হতাহতের সংখ্যা

2026-06-27T09:42:30+00:00
2026-06-27T13:04:23+00:00
  রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬,
১৪ আষাঢ় ১৪৩৩
 
রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প
মৃত বেড়ে ৯২০, উদ্ধারকাজে ধীরগতিতে অসন্তোষ বাড়ছে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬, ৯:৪২ এএম  আপডেট: ২৭.০৬.২০২৬ ১:০৪ পিএম
সংগৃহীত ছবি
জোড়া ভয়াবহ ভূমিকম্পের ভেনেজুয়েলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯২০ জনে। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও বহু মানুষ আটকা পড়ে থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

এদিকে উদ্ধারকাজের ধীরগতি ও প্রয়োজনীয় সহায়তার ঘাটতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বিভিন্ন দেশ জরুরি মানবিক সহায়তার আশ্বাস দিলেও দ্রুত ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম জোরদারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের ভাই হোর্হে রদ্রিগেজ দেশটির ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট। 

শুক্রবার (২৬ জুন) তিনি জানান, সরকারি হিসাবে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে ৯২০ হয়েছে।

এর আগে দেলসি রদ্রিগেজ ভূমিকম্পে প্রায় তিন হাজার মানুষ আহত হওয়ার তথ্য দেন। শুক্রবার ভূমিকম্পে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়ারা রাজ্য পরিদর্শনকালে তিনি জানান, বিদেশি উদ্ধারকারী দলগুলো সেখানে পৌঁছাতে শুরু করেছে।

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প হয় স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যায়—পরপর দুবার। ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্পে রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ধসে পড়ে বহু ভবন।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) আশঙ্কা, এই ভূমিকম্পে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। মৃত্যু নিয়ে এমন আশঙ্কা অমূলক নয়। সরকারের পক্ষ থেকে আনুমানিক কত মানুষ নিহত হতে পারেন, সে তথ্য দেওয়া না হলেও নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা একটি ওয়েবসাইটে পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৪৯ হাজার ৬০০ জনের নাম যুক্ত করা হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, এই ভূমিকম্পের প্রভাব ভেনেজুয়েলার প্রায় ৭০ লাখ মানুষের ওপর পড়তে পারে।

ভেনেজুয়েলার সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ভূমিকম্পে ২৫০টি ভবন ধ্বংস বা বিধ্বস্ত হওয়ার নিশ্চিত খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আটটি হাসপাতাল, রেডক্রস ভবন ও ফরাসি দূতাবাস ভবন রয়েছে।

আধুনিক কালের ইতিহাসে ভেনেজুয়েলায় এবারের ভূমিকম্পকে সবচেয়ে ভয়াবহ বলা হচ্ছে। ১৯৬৭ সালে দেশটিতে সর্বশেষ বড় ভূমিকম্প হয়েছিল। তখন ২৪০ জন নিহত হয়েছিলেন। এবারের ভূমিকম্পের পর কারাকাসের সাংবাদিক নিকোল কোলস্টার বলেন, ‘জীবনে এত শক্তিশালী ভূমিকম্প কখনো দেখিনি। মনে হচ্ছিল, পুরো ভবন আমার ওপর ভেঙে পড়বে।’

খোলা আকাশের নিচে : ভূমিকম্পের পর গত বৃহস্পতিবার রাতেও অনেক জায়গায় ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষের সাহায্যের জন্য আর্তনাদ শোনা গেছে। তাঁদের উদ্ধারে মাঠে নেমেছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মী, সেনাসদস্যের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ। অনেককে খালি হাতেই উদ্ধারকাজ করতে দেখা গেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক জায়গায় মশাল জ্বালিয়ে কাজ করতে দেখা গেছে মানুষজনকে।

উপকূলীয় শহর লা গুয়ারার বাসিন্দা হুয়ান অর্তিজ বিবিসিকে বলেন, তাঁর একজন বন্ধু মারা গেছেন। আরেক বন্ধু ধ্বংসস্তূপের নিচে। তাঁর পরিচিত প্রায় ২০ জনের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। কারাকাসের অধীন ‘চাকাও’-এর মেয়র গুস্তাভো দুকে বলেন, উদ্ধারকর্মীদের আশা, অনেকে জীবিত অবস্থায় আটকে আছেন। যত বেশি সম্ভব মানুষকে জীবিত উদ্ধার করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

অনেক মানুষ আবার ঘরবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন। এমনই একজন উপকূলীয় শহর লা গুয়ারার বাসিন্দা পেদ্রো পেরেজ। ভূমিকম্পে তাঁর বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে রাস্তায় বসবাস করছেন ৬৪ বছর বয়সী এই ব্যক্তি। ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত উপকূলীয় মোরন শহরের চিত্রও একই। সেখানে বিদ্যুৎ-পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

এসব শহরের অসহায় মানুষের দিকে হাত বাড়িয়ে দিতে দেখা গেছে স্বেচ্ছাসেবীদের। লা গুয়ারায় খাবার, পানি ও ওষুধ নিয়ে যাচ্ছিলেন তাঁরা। রয়টার্সের সাংবাদিকেরা ‘কোলেকতিভো’ নামে সরকারপন্থী মোটরসাইকেল দলের সদস্যদেরও উদ্ধারকাজে নামতে দেখেছেন। অন্য সময় তাঁরা বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের বিরক্ত করতেই ব্যস্ত থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

উদ্ধারকাজে ধীরগতিতে অসন্তোষ : রত্নি বোম্বার্ট ৩৩ বছর বয়সী একজন প্যারামেডিক। তিনি লা গুয়ারা এলাকার ওপিপি ৩৩ নামের একটি ভেঙে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে পাঁচ ঘণ্টা ধরে তাঁর মাকে খুঁজছেন। বোম্বার্ট বলেন, ভবনটি ১৫ তলা ছিল। কিন্তু এখন আর কিছুই বাকি নেই। তিনি বলেন, শুরুতে কোনো সরকারি উদ্ধারকারী দল এখানে আসেনি। তাদের অনুপস্থিতিতে নিরুপায় হয়ে স্থানীয় লোকজন নিজেরাই উদ্যোগ নেন। তাঁরা খালি হাতে এবং সাধারণ সরঞ্জাম দিয়ে ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে সাবধানে পথ তৈরি করে এগোতে থাকেন।

ধ্বংসস্তূপের মধ্যে মানুষের হাত, পা–বিচ্ছিন্ন দেহ এবং শিশুদের মৃতদেহ দেখার বীভৎস অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন রত্নি বোম্বার্ট।

দিয়েগো গঞ্জালেস নামের একজন উদ্ধারকারী বলেন, কাটিয়া লা মার নামের উপকূলীয় শহরের একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে তাঁর ৩৪ বছর বয়সী কাজিন হিলারি রদ্রিগেজকে টেনে বের করতে তিনি চার ঘণ্টা ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ করেছেন।

দিয়েগো বলেন, কাটিয়া লা মার শহরটি ধ্বংস হয়ে গেছে, সেখানে খুব কম ভবনই টিকে আছে। মানুষ খালি হাতে কাজ করছে, কিন্তু উদ্ধারকাজের জন্য যন্ত্রপাতি খুব জরুরি।

সহায়তার আশ্বাস : এই দুর্যোগের মধ্যে ভেনেজুয়েলাকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, মেক্সিকো, ডমিনিকান প্রজাতন্ত্র, এল সালভাদর, কাতার, ব্রাজিল, কলম্বিয়া, স্পেন, ফ্রান্স, তুরস্ক, সুইজারল্যান্ডসহ অনেক দেশ। দেশটিতে উদ্ধারকাজে সহায়তায় পরিবহন জাহাজ, উড়োজাহাজ, উদ্ধারকারী দল ও চিকিৎসাসহায়তা পাঠানো হচ্ছে। এরই মধ্যে সহায়তার জন্য মেক্সিকোর সেনাবাহিনীর সদস্যরা কারাকাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন।

যুক্তরাষ্ট্র ১৫ কোটি ডলারের সহায়তা ঘোষণা করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা দুটি ভূমিকম্প ভয়াবহ প্রাণহানি ঘটিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত সহায়তা দিতে প্রস্তুত। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র অবিলম্বে উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসাসহায়তা ও মানবিক ত্রাণ পাঠাচ্ছে।

চলতি বছরের শুরুতেই ভেনেজুয়েলায় মার্কিনবিরোধী প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে দেশটি থেকে তুলে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। এরপর দায়িত্ব নেওয়া ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করেছেন। সহায়তার আশ্বাস পেয়ে ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন দেলসি।

সহায়তার বিষয়ে জাতিসংঘের ত্রাণবিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার বলেছেন, আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলোর কাজ সমন্বয় করছে জাতিসংঘ। এই দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সমন্বিতভাবে বড় ধরনের সহায়তা প্রয়োজন হবে। কারণ, ভূমিকম্পের আগেই দেশটিতে টালমাটাল অবস্থার কারণে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল।


  বিষয়:   ভূমিকম্প  ভেনেজুয়েলা 


Loading...
Loading...

আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: