লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌরশহরে মা ও তিন মেয়েকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় পরিবারের একমাত্র ছেলে জুনায়েদ হোসেন সিফাত থানায় এজাহার দায়ের করেছেন। শুক্রবার (২৬ জুন) দুপুরে রায়পুর থানায় দায়ের করা এজাহারে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।
এদিকে, হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারকে গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকেও পৃথক একটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছেন রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া।
মা ও তিন মেয়েকে হত্যার ঘটনাটি এখনো রহস্যাবৃত। স্থানীয় বাসিন্দা, প্রতিবেশী ও স্বজনদের কেউ পুরোনো শত্রুতা, আবার কেউ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুটের উদ্দেশ্যকে হত্যার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছেন। তবে পুলিশ বলছে, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।
রায়পুর পৌর বণিক সমিতির সভাপতি ও সিফাতের দোকান মালিক সফিকুল ইসলাম মুরাদ জানান, নিহত শাহিনুর বেগম ভবনের মালিকের আস্থাভাজন ছিলেন। তিনি ভবনের সব ভাড়াটিয়ার মাসিক ভাড়া সংগ্রহ করতেন। ফলে প্রতি মাসে তার কাছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টাকা থাকত। অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার ভবনের সাবেক ভাড়াটিয়া হওয়ায় বিষয়টি জানতেন। তার ধারণা, টাকার লোভ থেকেই অন্তর ওই বাসায় প্রবেশ করেন।
শুক্রবার বিকেলে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর লাশ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আছর নামাজের পরপরই ধানহাটা নদীর পাড়ে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। জানাজায় অংশ নিতে ইতিমধ্যেই অনেক শ্রেনীপেশার মানুষ একত্রিত হয়েছেন। জানাজা শেষে মরদেহগুলো কুমিল্লার হোমনা উপজেলার নটিয়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাফনের জন্য নেওয়া হবে।
নিহত শাহিনুরের ভাই ছানা উল্যা বলেন, রায়পুরে তাদের কোনো শত্রু ছিল না। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার চান।
শাহিনুরের দেবর জামাল হোসেন বলেন, আমার ভাবি অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন। ভাতিজিরাও মেধাবী ও অমায়িক ছিল। কী কারণে এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল, তা আমরা বুঝতে পারছি না।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিহত শাহিনুরের বাবা দাদন মিয়া বলেন, আমার মেয়ে ও নাতনিদের কেন এভাবে মরতে হলো? তারা তো কোনো অপরাধ করেনি।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মনিরুজ্জামান। পরে রহস্য উদ্ঘাটনে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়। টিমের প্রধান করা হয়েছে রায়পুর থানার ওসি (তদন্ত) আব্দুল মান্নানকে।
ওসি শাহীন মিয়া জানান, ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি ছেনি ও পাটার শিল উদ্ধার করা হয়েছে। কী কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) অরুপ পাল জানান, নিহত চারজনের মাথা, বুক, হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারের মরদেহেরও ময়নাতদন্ত করা হবে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকালে রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা নদীপাড় সড়কের একটি পাঁচতলা ভবনের নিচতলার বাসায় ঢুকে শাহিনুর বেগম (৩৮), তার মেয়ে সায়মা আক্তার (২১), নাফিসা আক্তার ইকরা (১৭) ও ফাতেমা আক্তার শিফাকে (১০) কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
চিৎকার শুনে প্রতিবেশী আফরোজা বেগম রানী জানালা দিয়ে এক ব্যক্তিকে দেখতে পেয়ে ভবনের গেট বাইরে থেকে বন্ধ করে দেন। এতে অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার ভবনের ভেতরে আটকা পড়ে। পরে স্থানীয়রা বাসায় ঢুকে চারজনের রক্তাক্ত মরদেহ দেখতে পান।
একপর্যায়ে অন্তর পাশের ভবনের ছাদ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করলে উত্তেজিত জনতা তাকে আটক করে গণপিটুনি দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
স্থানীয়দের ধারণা, ভবনের সাবেক ভাড়াটিয়া হওয়ায় অন্তর জানতেন যে শাহিনুর বেগমের কাছে বাসাভাড়া বাবদ টাকা ও কিছু স্বর্ণালংকার থাকত। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই ডাকাতির উদ্দেশ্যে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে। তবে পুলিশ বলছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সম্ভাবনাকেই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।