বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ব্রাজিল ও স্কটল্যান্ড। ম্যাচটি ঘিরে সমর্থকদের আগ্রহ তুঙ্গে থাকলেও দুই দলের অতীত পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবেই এগিয়ে রাখছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে। এ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ফুটবলে মোট ১০ বার মুখোমুখি হয়েছে ব্রাজিল ও স্কটল্যান্ড। এর মধ্যে ৮ ম্যাচেই জয় পেয়েছে সেলেসাওরা। বাকি দুটি ম্যাচ ড্র হলেও স্কটল্যান্ড এখনো ব্রাজিলের বিপক্ষে কোনো জয় তুলে নিতে পারেনি।
পরিসংখ্যান আরও বলছে, এই ১০ ম্যাচে ব্রাজিল মোট ১৬টি গোল করেছে, যেখানে স্কটল্যান্ডের গোলসংখ্যা মাত্র ৩। গোল ব্যবধানেও তাই একচ্ছত্র আধিপত্য ব্রাজিলের। এর আগে বিশ্বকাপের মঞ্চেও একাধিকবার মুখোমুখি হয়েছে দল দুটি, যেখানে প্রতিবারই শক্তিমত্তার প্রমাণ দিয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার পরাশক্তিরা।
বিশ্বকাপে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের জন্য ম্যাচটির আবহ কিছুটা ভিন্ন। তাদের লক্ষ্য শুধু জয় তুলে নিয়ে গ্রুপে সেরা অবস্থানে থেকে পরবর্তী পর্বে যাওয়া। ব্রাজিল ও মরক্কো উভয়েরই চার পয়েন্ট রয়েছে। ফলে গ্রুপে শীর্ষস্থান নিশ্চিত করতে ব্রাজিলের জয় প্রয়োজন। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রাজিলের সর্বশেষ ম্যাচ ছিল ২০১১ সালে লন্ডনে একটি প্রীতি ম্যাচ। যেখানে মাত্র তৃতীয় আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নেমে নেইমার জোড়া গোল করেছিলেন।
ডেভিড ন্যারের বিখ্যাত গোল থেকে শুরু করে ১৯৯৮ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ পর্যন্ত, ব্রাজিল ও স্কটল্যান্ডের বিশ্বকাপ লড়াইগুলো গত শতাব্দীর শেষভাগে টুর্নামেন্টের এক পরিচিত অধ্যায় হয়ে উঠেছিল। দুই দল আবারো মুখোমুখি হচ্ছে গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ শেষ ম্যাচে।
মিয়ামিতে অনুষ্ঠিতব্য গ্রুপ সি-এর এই ম্যাচটি হবে বিশ্বকাপের মঞ্চে দুই দেশের পঞ্চম সাক্ষাৎ, যা টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি খেলা ম্যাচগুলোর একটি। অবশ্য এককভাবে সবচেয়ে বেশি নয়। কারণ ব্রাজিল বিশ্বকাপে সুইডেনের বিপক্ষে সাতবার খেলেছে, যার মধ্যে রয়েছে ১৯৫৮ সালের ফাইনাল এবং ১৯৯৪ সালের সেমিফাইনাল।
এ ছাড়া আর্জেন্টিনা ও জার্মানিও বিশ্বকাপে সাতবার মুখোমুখি হয়েছে, যার তিনটি ছিল ফাইনাল। ১৯৭৪ থেকে ১৯৯৮ সালের মধ্যে বিশ্বকাপে চারবার মুখোমুখি হয়েছিল ব্রাজিল ও স্কটল্যান্ড, এবং সবগুলোই ছিল গ্রুপ পর্বে। কারণ স্কটল্যান্ড কখনো প্রথম রাউন্ডের গন্ডি পেরোতে পারেনি।
১৯৮২ সালে সেভিলে ডেভিড ন্যারের গোলটি এখনো বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় গোল হয়ে আছে। তবে সেটি শেষ পর্যন্ত কাক্সিক্ষত ফল দেয়নি। বরং সক্রেটিস ও জিকোর নৈপুণ্যে ব্রাজিল ৪-১ ব্যবধানে জয় পায়।
১৯৭৪ সালে পশ্চিম জার্মানিতে কেনি ডালগিশের স্কটল্যান্ড জারগিনহোম রিভেলিনোর ব্রাজিলকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে রাখে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গোল ব্যবধানে বিদায় নিতে হয় স্কটদের। ১৯৯০ সালের ইতালিয়া বিশ্বকাপে শেষ মুহূর্তের একটি গোল ব্রাজিলকে ১-০ ব্যবধানে জয় এনে দেয়। আর ১৯৯৮ সালে স্কটল্যান্ড রোনাল্ডো, রিভালদো, বেবেতোকে গোল করতে না দিলেও টম বযয়েডের আত্মঘাতী গোলে ম্যাচটি ২-১ ব্যবধানে হেরে যায়। এবার স্কটল্যান্ডের সামনে ইতিহাস গড়ার সুযোগ। তারা প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে উঠতে চায়।
বোস্টনে হাইতির বিপক্ষে ১-০ গোলের জয় দিয়ে অভিযান শুরু করলেও পরে মরক্কোর কাছে একই ব্যবধানে হারে দলটি। তবে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ড্র করলেই সম্ভবত সেরা আট তৃতীয় স্থানধারী দলের একটি হিসেবে পরবর্তী পর্বে উঠে যাবে তারা। এমনকি হারলেও তিন পয়েন্ট নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে। স্কটিশ ডিফেন্ডার জ্যাক হেন্ড্রি বলেন, ব্রাজিলের অসাধারণ ইতিহাস রয়েছে, আর আমরা বুধবার সেই ধারাকে ব্যাহত করতে চাই।
তিনি বলেন, পরের রাউন্ডে উঠতে হলে এমন দলের বিপক্ষেই খেলতে চাই। এটা দারুণ এক ম্যাচ হতে যাচ্ছে। এ ম্যাচেই হয়তো দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে মাঠে ফিরতে পারেন নেইমার। ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা ৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড চোটের কারণে ২০২৩ এর অক্টোবরের পর আর জাতীয় দলের হয়ে খেলেননি। কোচ কার্লো আনচেলত্তি তাকে দলে ডাকলেও পরে ডান পায়ের পেশীতে আরেকটি চোট পান, যার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ব্রাজিলের প্রথম দুই ম্যাচে খেলতে পারেননি। তবে এখন তিনি খেলার জন্য প্রস্তুত।
সি গ্রুপে বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার ভোর ৪টায় স্কটল্যান্ডের মুখোমুখি হবে ব্রাজিল। দুই ম্যাচে ৪ পয়েন্ট নিয়ে এ মুহূর্তে গ্রুপেশীর্ষে বিশ্বকাপের রেকর্ড পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নরা। স্কটল্যান্ডের পয়েন্ট ৩, গ্রুপে অবস্থান তৃতীয়। ২০২৩ সালে সবশেষ ব্রাজিলের হয়ে খেলেলেন নেইমার। বিশ্বকাপ বাছাইয়ে উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে হাঁটুর চোটে এরপর থেকেই ভুগছেন তিনি। হলুদ জার্সি আর গায়ে জড়াতে পারেননি। নেইমারের দলে ফিরে আসার খুশির দিনেই পুরো দলকে ভাবিয়ে তুলেছে রাইট উইঙ্গার, রাফিনহার চোট। অন্তত দুটো ম্যাচে চোটের জন্য যে তিনি দলের বাইরে চলে গিয়েছেন, এখনই বলে দেওয়া যায়।
৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডের ক্লাবেও সময়টা ভালো যায়নি। সৌদি আরবে গিয়ে এবং ব্রাজিলে ফিরেও ধুঁকতে হয় তাকে। তবে, গত বছর ঘরের ক্লাব সান্তোসে ফিরে, থমকে থাকা ক্যারিয়ারে গতি ফেরাতে সচেষ্ট হন নেইমার।
এ বছরে সান্তোসের হয়ে খেলা ১৫ ম্যাচে ৬ গোল করেছেন নেইমার, অ্যাসিস্টও আছে ৪টি। তবে, গত ফেব্রুয়ারিতে হাঁটুর অস্ত্রোপচারের পর কখনই টানা চার ম্যাচ খেলতে পারেননি বার্সেলোনার এই সাবেক তারকা। আলোচনা-সমালোচনা সত্ত্বেও নেইমারকে নিয়ে উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের দল দেন ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি। অবশ্য, এখনও মাঠে নামা হয়নি তার। দলের মরক্কোর বিপক্ষে ১-১ ড্র এবং হাইতির বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়, তিনি দেখেছেন বেঞ্চে বসে।
বেঞ্চ থেকে মাঠে নামার পথটা তৈরি হয়, কদিন আগে নেইমার অনুশীলনে ফিরলে। স্কটল্যান্ড ম্যাচ সামনে রেখে গত সোমবার হওয়া টেকটিক্যাল সেশনেও ছিলেন তিনি। তাতে, দলের সর্বোচ্চ গোলদাতার গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে খেলার সম্ভাবনা জোরাল হয়েছে। সতীর্থ মার্তিনেল্লি দিয়েছেন ইতিবাচক ইঙ্গিত।
সে খুবই উঁচু পর্যায়ের পারফরম্যান্স করেছে (অনুশীলনে) এবং আপনারা আজকের ট্রেনিং সেশনে তার তীব্রতা দেখেছেন। আমাদের সাথে থাকার জন্য সে কতটা আগ্রহী, সেটা আপনারা দেখেছেন। তার মান প্রশ্নাতীত।
তবে, সে খেলবে কিনা, এই প্রশ্নটা কোচের জন্য (উত্তর কোচের কাছে), কিন্তু আমি মনে করি, সে দারুণ অবস্থায় আছে। তবে ফুটবলে অতীতের পরিসংখ্যান সবসময় ভবিষ্যতের ফল নির্ধারণ করে না। স্কটল্যান্ড এবার ইতিহাস বদলের লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামবে। অন্যদিকে নিজেদের অপরাজিত রেকর্ড অক্ষুণ্ন রাখতে মরিয়া থাকবে ব্রাজিল। সব মিলিয়ে, ইতিহাস ও পরিসংখ্যান ব্রাজিলকে স্পষ্টভাবে এগিয়ে রাখলেও বিশ্বকাপের মঞ্চে যে কোনো মুহূর্তে চমক দেখা যেতে পারে, যা ম্যাচটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে তাদের দেখা গিয়েছিল ১৯৯৮ সালে। তার পরে কেটে গিয়েছে ২৮ বছর। অবশেষে বাছাই পর্বের গন্ডি টপকে বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে স্কটল্যান্ড। ক্লাব ফুটবলে দাপট দেখানোর পরে এ বার রাসমুস হোইলুন্দ, স্কট ম্যাকটমিনেদের সামনে চ্যালেঞ্জ দেশের হয়ে জ্বলে ওঠার। তবে এ বারেও সামনে চেনা শত্রু। আরও একবার গ্রুপ পর্বে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে খেলতে হবে স্কটল্যান্ডকে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এখনও পর্যন্ত সেলেকাওদের বিরুদ্ধে একটা ম্যাচেও জিততে পারেনি তারা। এ বার পাল্টাবে সেই ইতিহাস? তবে বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের ইতিহাস খুব একটা উজ্জ্বল নয়। এখনও পর্যন্ত ২৩টি ম্যাচ খেলে মাত্র চারটিতে জয় পেয়েছে তারা। আর সেই জয়গুলোর কোনওটিই আসেনি ব্রাজিলের বিরুদ্ধে।