ফুটবল বিশ্বের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, কোটি ভক্তের হৃদয়ের স্পন্দন, মাঠের শিল্পী ও জাদুকর লিওনেল মেসির ৩৯তম জন্মদিন আজ। অসাধারণ ড্রিবলিং, নিখুঁত পাস, অবিশ্বাস্য গোল এবং অসংখ্য রেকর্ডের মাধ্যমে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের একজন হিসেবে। ফুটবলের সৌন্দর্যকে নতুন মাত্রা দেওয়া এই কিংবদন্তির জন্মদিনে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তাঁর অগণিত ভক্তদের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। শুভ জন্মদিন, ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসি—আপনার জাদুতে মুগ্ধ হোক আগামী প্রজন্মও।
২৪ জুন। সান্তা ফে প্রোভিন্সের রোজারিওর শহরের জন্মগ্রহণ করেন মা-বাবার তৃতীয় সন্তান। যিনি এক সময় হয়ে উঠলেন ফুটবল বিশ্বের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র। ১৯৮৭ সালের সেই ২৪ জুনের পর এক এক করে কেটে গেছে ৩৮টি বছর। আজ লিওনেল মেসি পা দিলেন ৩৯তম বর্ষে।
ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে অধিকাংশ কিংবদন্তিই যখন অতীতের স্মৃতিতে পরিণত হন, তখন মেসি যেন নতুন করে ইতিহাস লিখছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা অধিনায়ক শুধু দলকে নকআউট পর্বের পথে এগিয়ে নিচ্ছেন না, গড়ছেন একের পর এক বিশ্বরেকর্ডও।
নিওয়েল ওল্ড বয়েজে ফুটবলে হাতেখড়ি, এরপর বার্সেলোনার লা মাসিয়া, এর মধ্যে গ্রোথ হরমোনের সমস্যায় ভুগতে থাকা এক স্বপ্ন দেখা বালকের ব্যায়বহুল চিকিৎসা- জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে লিওনেল মেসি আজ পরিণত। বিশ্বের সেরা ফুটবলার। তর্কহীনভাবে সর্বকালের সেরা ফুটবলারও বলা হচ্ছে এখন তাকে।
চার বছর আগে, কাতারে বিশ্বকাপ ট্রফিটা উঠেছিল তার হাতে। সে সময়ই বলা যায় ক্যারিয়ারে পূর্ণতা পেয়েছিলেন তিনি। ফুটবলকেও গৌরবান্বিত করেছিলেন। চার বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে যেন আরও বেশি দুর্ধর্ষ তিনি, আর বেশি বিধ্বংসী। দুই ম্যাচেই ৫ গোল করে তার প্রমাণ দিয়েছেন। গড়ছেন রেকর্ডের পর রেকর্ড।
বিশ্বকাপে মেসির নামের পাশে এখন জ্বলজ্বল করছে ১৮ গোল, যা তাকে ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসিয়েছে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়ে জোড়া গোল করে তিনি ভেঙে দেন জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড। বর্তমানে বিশ্বকাপের সর্বকালের গোলদাতাদের তালিকায় সবার ওপরে আছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
ক্যারিয়ারের প্রায় দুই দশক পেরিয়ে গেলেও মাঠে তার প্রভাব, নেতৃত্ব এবং গোল করার ক্ষুধা এখনও একই রকম তীব্র। বরং এবারের বিশ্বকাপে এসে তিনি যেন নিজের উচ্চতাকে আরও উঁচুতে নিয়ে গেছেন। বয়স যখন ৩৯-এর দোরগোড়ায়, তখন মেসি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে নতুন এক মাইলফলক গড়েছেন।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে মেসির নামের পাশে ছিল ১৩ গোল। এরপর আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে তিনি স্পর্শ করেন জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড। কিন্তু সেখানে থেমে থাকেননি। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষেদ্বিতীয় ম্যাচে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপের সর্বকালের গোলদাতাদের তালিকায় এককভাবে শীর্ষে উঠে গেলেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। এখন তার গোলসংখ্যা ১৮টি।
ডালাসে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল মেসির জন্য আবেগ আর ইতিহাসের এক মিশ্রণ। ম্যাচের শুরুতেই পেনাল্টি পেয়ে গিয়েছিল আর্জেন্টিনা। সেই সুযোগ থেকে গোল করে রেকর্ড ভাঙার সুবর্ণ সুযোগ ছিল মেসির সামনে। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে শটটি পোস্টের বাইরে চলে যায়। পুরো স্টেডিয়াম যেন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
তবে মেসির মতো খেলোয়াড়দের বিশেষত্বই হলো, তারা হতাশাকে শক্তিতে রূপ দিতে জানেন। ৩৮ মিনিটে আর্জেন্টিনার দারুণ এক আক্রমণ থেকে ফাকুন্দো মেদিনার কাটব্যাক পেয়ে বাম পায়ের নিখুঁত শটে গোল করেন তিনি। সেই গোলেই ক্লোসার রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যান।
এরপর ম্যাচের শেষ দিকে আবারও জ্বলে ওঠেন আর্জেন্টাইন জাদুকর। দ্রুতগতির এক পাল্টা আক্রমণে হুলিয়ান আলভারেজের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর বল আসে মেসির কাছে। প্রথম শট প্রতিহত হলেও ফিরতি বলে আর ভুল করেননি তিনি। বল জড়িয়ে যায় জালে, আর ইতিহাসের পাতায় এককভাবে নিজের নাম লিখে ফেলেন মেসি।
রেকর্ড গড়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অভিনন্দন বার্তা আসতে থাকে। সবচেয়ে আলোচিত বার্তাটি আসে মিরোস্লাভ ক্লোসার কাছ থেকে। জার্মান কিংবদন্তি বলেন, ‘আমার কাছে লিওনেল মেসিই সর্বকালের সেরা ফুটবলার। অভিনন্দন, চ্যাম্পিয়ন!’ বিশ্বকাপজয়ী এই সাবেক স্ট্রাইকার এর আগেও জানিয়েছিলেন, তার রেকর্ড যদি কেউ ভাঙেন, তাহলে মেসির মতো একজন ফুটবল প্রতিভাই সেটির যোগ্য দাবিদার।
মজার ব্যাপার হলো, ছয়টি বিশ্বকাপ খেললেও একটি আসরে গোল করতে পারেননি মেসি। সেটি ছিল ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ। বাকি প্রতিটি বিশ্বকাপেই গোল করেছেন তিনি। অন্যদিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী রোনালদো টানা ৬টি বিশ্বকাপে গোল করে বিরল রেকর্ড গড়েন।
২০০৬ সালে কিশোর প্রতিভা হিসেবে যাত্রা শুরু করা ফুটবলারটি আজ বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। এর মধ্যে তিনি জিতেছেন বিশ্বকাপ, খেলেছেন একাধিক ফাইনাল এবং অসংখ্য স্মরণীয় ম্যাচের নায়ক হয়েছেন।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ শেষে মেসি নিজেও রেকর্ডের চেয়ে দলের সাফল্যকেই বড় করে দেখেছেন। তিনি বলেন, ‘জয়ের জন্য আমি খুব খুশি। এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি ম্যাচ। পেনাল্টি মিস করেছিলাম; কিন্তু পরে আমরা পরিস্থিতি সামলে নিয়েছি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দল জিতেছে এবং আমরা পরের পর্বের খুব কাছে চলে এসেছি।’
আর্জেন্টিনা ইতোমধ্যে টানা দ্বিতীয় জয়ে নকআউট পর্বের দরজায় পৌঁছে গেছে। ৩৯তম জন্মদিনে এসে তিনি শুধু আর্জেন্টিনার নয়, পুরো ফুটবল বিশ্বের জন্যই এক অনন্য অনুপ্রেরণার নাম। বয়সের ভারকে উপেক্ষা করে এখনও তিনি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা।
বয়স তার গতি কমাতে পারেনি, ক্ষুধা কমাতে পারেনি, ইতিহাস গড়ার তাড়নাও কমাতে পারেনি। বরং ২০২৬ বিশ্বকাপ প্রমাণ করছে, লিওনেল মেসি এখনও বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রদের একজন।