রায়গঞ্জে জলাবদ্ধতার ফাঁদে কৃষি, অনাবাদি ৮৩৩ হেক্টর জমি

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি

সারাদেশ

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এখন আর শুধু বর্ষাকালের দুর্ভোগ নয়; এটি কৃষি উৎপাদন, কৃষকের জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতির জন্য বড়

2026-06-16T15:57:24+00:00
2026-06-16T15:58:04+00:00
  সোমবার, ২২ জুন ২০২৬,
৮ আষাঢ় ১৪৩৩
 
সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
সারাদেশ
রায়গঞ্জে জলাবদ্ধতার ফাঁদে কৃষি, অনাবাদি ৮৩৩ হেক্টর জমি
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি
মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬, ৩:৫৭ পিএম  আপডেট: ১৬.০৬.২০২৬ ৩:৫৮ পিএম
সংগৃহীত ছবি
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এখন আর শুধু বর্ষাকালের দুর্ভোগ নয়; এটি কৃষি উৎপাদন, কৃষকের জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের সংকটে পরিণত হয়েছে। খাল-নালা ভরাট, অপর্যাপ্ত ব্রিজ-কালভার্ট, অপরিকল্পিত পুকুর খনন এবং দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের ২৪টি গ্রামের প্রায় ৮৩৩ হেক্টর ফসলি জমি বছরের অধিকাংশ সময় পানির নিচে থাকে। ফলে প্রতিবছর প্রায় ২ হাজার ৯০০ থেকে ৩ হাজার ৩০০ টন ধান উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ধামাইনগর, ধুবিল, সোনাখাড়া, পাঙ্গাসী, নলকা, ঘুড়কা, ধানগড়া, চান্দাইকোনা ও ব্রহ্মগাছা ইউনিয়নের অন্তত ২৪টি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতা বিরাজ করছে। কোথাও খাল-নালা ভরাট হয়ে পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে, আবার কোথাও অপর্যাপ্ত কালভার্ট, অপরিকল্পিত পুকুর খনন এবং পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ দখল করে বসতবাড়ি ও স্থাপনা নির্মাণের কারণে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বছরের পর বছর বিস্তীর্ণ কৃষিজমি অনাবাদি পড়ে থাকছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতি হেক্টর জমিতে গড়ে ৩ দশমিক ৫ থেকে ৪ টন ধান উৎপাদন হওয়ার কথা। কিন্তু জলাবদ্ধতার কারণে বছরে প্রায় ২ হাজার ৯০০ থেকে ৩ হাজার ৩০০ টন ধান উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমান বাজারমূল্যে এর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৯ থেকে ১১ কোটি টাকা। সার, বীজ, শ্রম, সেচ ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় বিবেচনায় মোট অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে ১২ থেকে ১৫ কোটি টাকায় পৌঁছাচ্ছে।

সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে পানি জমে রয়েছে। কিছু এলাকায় বোরো মৌসুমে সীমিত পরিসরে ধান চাষ করা গেলেও রোপা আমন আবাদ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ এলাকায় বছরের দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধতা থাকায় স্বাভাবিক ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

দীর্ঘদিনের এ সমস্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকেরা। জমি থাকলেও আবাদ করতে না পারায় অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। কৃষিকাজে আগ্রহ হারিয়ে কেউ কেউ বিকল্প পেশার কথা ভাবছেন। তাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর একই সমস্যা চললেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।

ধুবিল ইউনিয়নের চকদাদপুর গ্রামের কৃষক আব্দুস সালাম শেখ বলেন, বছরের পর বছর এই জলাবদ্ধতার সঙ্গে যুদ্ধ করে আমরা ক্লান্ত। জমিতে পানি জমে থাকায় সময়মতো চাষ করা যায় না। ধার-দেনা করে সংসার চালাতে হচ্ছে। ফসলের বদলে এখন আমাদের জীবনজুড়ে শুধু অনিশ্চয়তা।

ব্রহ্মগাছা ইউনিয়নের কৃষক মজনু বলেন, আমাদের কষ্টটা কেউ দেখে না। বছরের পর বছর জমি পানির নিচে পড়ে থাকে। জমি আছে, কিন্তু চাষ করার সুযোগ নেই। ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া আর সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। কৃষক হয়ে আমরা এখন দিশেহারা।

সোনাখাড়া এলাকার কৃষক আরিফুল ইসলাম বলেন, আগে এই জমিতে বছরে দুটি ফসল হতো। এখন পানি জমে থাকায় একটি ফসলও ঠিকমতো হয় না। জমি আছে, কিন্তু ফসল নেই—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় কষ্ট।

সংশ্লিষ্টদের মতে, রায়গঞ্জের স্থায়ী জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ প্রাকৃতিক খাল-নালা ও জলাধার ভরাট হয়ে যাওয়া। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্রিজ-কালভার্টের অভাব, পানি নিষ্কাশনের পথ দখল করে স্থাপনা নির্মাণ এবং যত্রতত্র অপরিকল্পিত পুকুর খননের কারণে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ফলে প্রতিবছর জলাবদ্ধতা আরও প্রকট আকার ধারণ করছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, রায়গঞ্জের কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা দীর্ঘদিনের সমস্যা। এতে কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে। আমরা মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছি। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য খাল পুনঃখনন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ জরুরি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল খালেক পাটোয়ারী বলেন, জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ঘুড়কা ইউনিয়নের ঘুড়কা নতুনপাড়া এলাকায় উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় পাইপলাইন স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় ২০ বছরের জলাবদ্ধতা নিরসন করা হয়েছে। এছাড়া কোথায় খাল খনন, ড্রেন সংস্কার, পাইপলাইন ও কালভার্ট প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। পর্যায়ক্রমে স্থায়ী সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, রায়গঞ্জের জলাবদ্ধতা শুধু একটি মৌসুমি সমস্যা নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদন, খাদ্যনিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি। দ্রুত খাল-নালা পুনঃখনন, দখলমুক্তকরণ, পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় স্থানে পাইপলাইন ও কালভার্ট নির্মাণ না হলে প্রতিবছর কৃষিজমি অনাবাদি বাড়বে, উৎপাদন কমবে এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে। স্থানীয়দের দাবি, স্থায়ী সমাধানে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।


Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: