আধুনিক ছয়তলা ভবন, দুটি লিফট, আইসিইউ কক্ষ ও উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জাম—সবই আছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বর্তমানে নামেমাত্র ১০০ শয্যার হাসপাতাল হলেও কার্যত ৫০ শয্যারও কম সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রায় চার লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার একমাত্র ভরসা শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। হাসপাতালটিকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করে নতুন ভবন নির্মাণ করা হলেও জনবল সংকটের কারণে চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিদিন রোগীর চাপ বাড়লেও সে অনুপাতে নেই চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কর্মচারী।
রোগীদের অভিযোগ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও অনেক সময় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের দেখা মেলে না। আইসিইউ কক্ষ থাকলেও তা দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ। গাইনি বিশেষজ্ঞ ও সার্জনের অভাবে বন্ধ রয়েছে অপারেশন থিয়েটারের (ওটি) কার্যক্রম। ফলে দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের চিকিৎসার জন্য দূর-দূরান্তে যেতে হচ্ছে।
হাসপাতালের অবকাঠামোগত সমস্যাও কম নয়। নিম্নমানের নির্মাণকাজের কারণে ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে থাকে হাসপাতাল চত্বরে। রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, টয়লেট ও গোসলখানার পরিবেশ অত্যন্ত নাজুক। পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সম্ভব হচ্ছে না। দুর্গন্ধে অনেক সময় টয়লেট ব্যবহার করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
সম্প্রতি হাসপাতালের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। হাসপাতালের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজেদের অর্থায়নে দুইজন কর্মী নিয়োগ দিয়ে কোনোমতে পরিচ্ছন্নতার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
হাসপাতালে রোগী ওঠানামার জন্য থাকা দুটি লিফটই প্রায়শ ত্রুটিপূর্ণ অবস্থায় বন্ধ থাকে। ফলে ভর্তি রোগীদের চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় নিতে স্বজনদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। পর্যাপ্ত ট্রলি না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে ভ্যানে কিংবা কাঁধে করে উপরে তুলতে দেখা যায়।
এদিকে হাসপাতালের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। ১০ জন জুনিয়র কনসালট্যান্টের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৭ জন। ৪১ জন সহকারী সার্জন ও মেডিকেল অফিসারের স্থলে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ২৬ জন। এছাড়া নার্স, মিডওয়াইফ, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, ওয়ার্ড বয়, আয়া, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী ও অন্যান্য চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর বহু পদ শূন্য রয়েছে।
চিকিৎসা নিতে আসা রনি মুন্সি বলেন, “এত বড় হাসপাতালে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পাওয়া যায় না। টয়লেট ব্যবহারের অনুপযোগী, রোগীদের খাবারের মানও ভালো নয়। নানা সমস্যার কারণে সাধারণ মানুষ দুর্ভোগে পড়ছে।”
তবে বর্তমান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফাতেমা মেহজাবিন দায়িত্ব গ্রহণের পর কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। বর্তমানে সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসা, কুকুরের কামড়ের ভ্যাকসিনসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় টিকা বিনামূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে।
ডা. ফাতেমা মেহজাবিন বলেন, “রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু জনবল সংকটের কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ১০০ শয্যার হাসপাতালের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল পেলে শতভাগ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। শূন্য পদ পূরণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।”
স্থানীয়দের দাবি, আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি দ্রুত জনবল নিয়োগ ও হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন না হলে শিবচরের লাখো মানুষের চিকিৎসাসেবা সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠবে।