ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আর জমকালো আসর বসছে উত্তর আমেরিকার তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায়। ৪৮টি দলের এই সুবিশাল মহাযজ্ঞে যখন মেক্সিকো সিটির এস্তাদিও আসতেকায় প্রথম বাঁশি বাজবে, তখন গ্যালারির উন্মাদনা ছাপিয়ে এক অদ্ভুত আবেগ ছুঁয়ে যাবে ফুটবলপ্রেমীদের। ফুটবল নিয়তির চিরন্তন সেই নিয়ম, এক প্রজন্মের বিদায়ের বেদনার পিঠেই চড়ে আসে নতুন প্রজন্মের আগমনের আনন্দ। কবিগুরুর অমর সেই বাণীকে মনে করিয়ে দিয়ে এবারের বিশ্বকাপ যেন বলতে চাইছে তোমার হলো শুরু, আমার হলো সারা।
একদিকে ক্যারিয়ারের গোধূলি লগ্নে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো ট্রফি ছোঁয়ার ব্যাকুলতা, অন্যদিকে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রথম পদচিহ্ন এঁকে দিয়ে সিংহাসন দখলের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। এই দুই বিপরীত স্রোতের মিলনমেলাই হতে যাচ্ছে এবারের বিশ্বকাপ।
শেষ অঙ্কের শেষ সুর; যাদের এটিই শেষ বিশ্বকাপ
ফুটবলের সবুজ ক্যানভাসে যারা গত দেড় দশক ধরে তুলির শেষ আঁচড় কেটেছেন, তাদের অনেকের জন্যই এই টুর্নামেন্ট হতে যাচ্ছে ক্যারিয়ারের শেষ মহাকাব্য । বয়স আর সময়ের অমোঘ নিয়মে এটাই তাদের বিশ্বমঞ্চের শেষ নৃত্য।
লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা): ২০২২ সালে মরুভ‚মির বুকে সোনার ট্রফি উঁচিয়ে ধরে ফুটবল অমরত্ব পেয়েছেন। ৩৯ ছুঁইছুঁই মেসি আবারও আলবিসেলেস্তেদের আকাশি-সাদা জার্সিতে নামছেন। ফুটবলবিশ্ব জানে, আমেরিকার এই মাঠগুলোতেই হয়তো শেষবারের মতো দেখা যাবে এলএমটেনের জাদুকরী ড্রিবলিং আর নিখুঁত ফ্রি-কিক। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে তার বিদায়ের সুরটা কতটা মধুর হয়, সেটাই দেখার অপেক্ষা।
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো (পর্তুগাল): ফুটবলের ইতিহাসে রেকর্ডের বরপুত্র ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ৪১ বছর বয়সেও দমে যাননি। অবিশ্বাস্য ফিটনেস ধরে রেখে পর্তুগালকে নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত সিআরসেভেন। ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া এই কিংবদন্তির জন্য এটাই বিশ্বজয়ের শেষ সুযোগ। আক্রমণভাগের এই সেনাপতির বিদায়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফুটবলের একটি ঐতিহাসিক মহাকাব্যের অবসান ঘটবে।
লুকা মদরিচ (ক্রোয়েশিয়া): মাঝমাঠের ক্রোয়াট জাদুকর লুকা মদরিচের বয়সও এখন ৪০। ২০১৮ সালের রানার্স-আপ ও ২০২২ সালের তৃতীয় স্থান অর্জনকারী ক্রোয়েশিয়া দলের এই প্রাণভোমরার শেষ বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে এটি। তার চিরচেনা পাসিং আর মাঠের নিয়ন্ত্রণ মিস করবে পুরো ফুটবল বিশ্ব।
মোহাম্মদ সালাহ (মিশর): লিভারপুলের ‘মিশরীয় রাজা’ মোহাম্মদ সালাহ ৩৪ বছর বয়সে পা দেবেন। আফ্রিকান ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই ফরোয়ার্ডের জন্য বৈশ্বিক মঞ্চে নিজের সেরাটা উজাড় করে দেওয়ার এটাই শেষ এবং সবচেয়ে বড় সুযোগ। ক্যারিয়ারের পড়ন্ত বিকেলে দাঁড়িয়ে মিশরকে বিশ্বমঞ্চে কতদূর নিয়ে যেতে পারেন, তার ওপর নজর থাকবে কোটি ফুটবল ভক্তের।
কেভিন ডি ব্রুইনা (বেলজিয়াম): বেলজিয়ামের ফুটবলের সোনালি প্রজন্মের অন্যতম প্রধান কারিগর এবং বিশ্বের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার কেভিন ডি ব্রুইনা। ৩৪ বছর বয়সী এই প্লেমেকারের দুর্দান্ত ক্রস, দূরপাল্লার জোরালো শট আর চোখ ধাঁধানো অ্যাসিস্টের জাদুতে মুগ্ধ হয়েছে ফুটবলবিশ্ব। বেলজিয়ামের জার্সিতে এটিই হয়তো তার শেষ বিশ্বকাপ। শেষবেলায় এসে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে দেশের জন্য বড় কোনো সাফল্য বয়ে আনার এটাই শেষ সুযোগ।
নতুন সূর্যের উদয়; যাদের কেবল শুরু পুরনো তারকারা যখন মঞ্চ ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন একঝাঁক তরুণ তুর্কি তৈরি হচ্ছেন সেই শূন্যস্থান পূরণ করে ফুটবলের নতুন সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে। গতি, স্কিল আর তারুণ্যের মিশেলে এরাই আগামীর বিশ্ব কাঁপাবেন।
জুড বেলিংহাম (ইংল্যান্ড): মাত্র ২২ বছর বয়সেই রিয়াল মাদ্রিদ এবং ইংল্যান্ডের মাঝমাঠের কান্ডারি হয়ে উঠেছেন জুড বেলিংহাম। মাঠে তার পরিপক্বতা আর গোল করার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা তাকে এই বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা আকর্ষণে পরিণত করেছে। থ্রি লায়ন্সদের বহু বছরের আক্ষেপ ঘুচিয়ে ট্রফি ঘরে তোলার গুরুদায়িত্ব থাকবে এই তরুণের কাঁধেই।
জামাল মুসিয়ালা (জার্মানি): জার্মানির ফুটবলে নতুন আশার আলো জামাল মুসিয়ালা। তার পায়ের কাজ, গতি আর ড্রিবলিং প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে চুরমার করার জন্য যথেষ্ট। জার্মানির আক্রমণভাগের মূল ভরসা ২৩ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড।
ফ্লোরিয়ান ভিরটজ (জার্মানি): মুসিয়ালার সাথে জার্মানির মাঝমাঠকে সচল রাখার দায়িত্ব থাকবে বায়ার লেভারকুসেনের হয়ে ত্রাস সৃষ্টি করে লিভারপুলে পাড়ি জমানো ফ্লোরিয়ান ভিরটজের ওপর। দূরপাল্লার শট আর পাসের জন্য তিনি ইতিমধ্যেই ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম বড় বিজ্ঞাপন।
লামিন ইয়ামাল (স্পেন): লা ফুরিয়ারোজাদের নতুন বিস্ময় ল্যামিন ইয়ামাল। অবিশ্বাস্য কম বয়সে বার্সেলোনা ও স্পেনের মূল দলে জায়গা করে নেওয়া এই উইঙ্গারের এটিই হতে যাচ্ছে প্রথম বিশ্বকাপ। তার গতি আর উইং ধরে আক্রমণে ওঠার সহজাত ক্ষমতা এবারের বিশ্বকাপে নতুন রূপকথা লিখতে পারে। স্পেনের এই তরুণ কেমন করেন এবারের বিশ্বকাপে, তা দেখতে মুখিয়ে আছেন বিশ্বের কোটি ফুটবলপ্রেমী।
ইতিহাস সাক্ষী, প্রতিটি বিশ্বকাপই কোনো না কোনো মহাতারকাকে বিদায় জানায় আর জন্ম দেয় নতুন কোনো কিংবদন্তির। ২০০৬ বিশ্বকাপে জিনেদিন জিদানের বিদায়ের রাতে যেমন লিওনেল মেসির আগমনী বার্তা পেয়েছিল বিশ্ব, ঠিক তেমনি এবারের বিশ্বকাপেও মেসি-রোনালদোদের প্রস্থানের ক্ষণে রাজত্ব বুঝে নেবেন বেলিংহাম কিংবা ইয়ামালরা।
একদিকে বিদায়ের করুণ সুর, অন্যদিকে নতুনের জয়গান ফুটবলের এই চিরন্তন রূপ দেখতেই চোখ জুড়াবে কোটি ফুটবল ভক্তের। মাঠের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কার মুখে শেষ হাসি ফোটে, আর কার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের মহাকাব্য শুরু হয়, তা সময়ই বলে দেবে। তবে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এই আসরটি হবে আজীবন মনে রাখার মতো এক বিশ্বআসর।