বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ ঘিরে ইতিমধ্যেই বাড়ছে উত্তেজনা। এবারের ২৩তম গ্রেটেস্ট শো অব আর্থ হবে নতুন ফরম্যাট, বাড়তি দল এবং একাধিক দেশের যৌথ আয়োজনে।
এবার বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও বৈচিত্র্যময় আসরগুলোর একটি। প্রথমবারের মতো এই টুর্নামেন্টে অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দল, যা আগের ৩২ দলের তুলনায় বড় পরিবর্তন। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয় এটি হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড়, বৈচিত্র্যময় এবং প্রতিযোগিতাপূর্ণ ফুটবল উৎসব।
এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো এই তিন দেশে একসাথে অনুষ্ঠিত হবে আসরটি, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম যৌথ আয়োজন। টুর্নামেন্ট শুরু হবে ১২ জুন এবং ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। এবার ম্যাচের সংখ্যাও বেড়ে হয়েছে ১০৪টি। তিনটি দেশের ১৬টি শহরে অনুষ্ঠিত হবে: যুক্তরাষ্ট্রে ১১টি, মেক্সিকোতে তিনটি এবং কানাডায় দুটি।
ফলে দর্শকদের জন্য থাকছে আরও বাড়তি উত্তেজনা ও আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ উপভোগ করার সুযোগ। এবারের বিশ্বকাপ ঘিরে বড় আলোচনার একটি বিষয় দুই কিংবদন্তি লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। বয়সের কারণে ২০২৬ আসরটি তাদের ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ হতে পারে। ভক্তরা তাই আশা করছেন, এই দুই তারকা আরেকবার বিশ্বমঞ্চে নিজেদের জাদু দেখাবেন, যা এবারের আসরকে আরও আবেগঘন করে তুলতে পারে।
ইতিমধ্যেই দলগুলো প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। মাত্র দেড় লাখ জনসংখ্যার ছোট দেশ কুরাসাও প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়ে চমক দেখিয়েছে, যা ফুটবল বিশ্বে নতুন গল্প তৈরি করছে। এদিকে বড় দলগুলোর মাঝেও উত্তেজনা তুঙ্গে। কেউই ছাড় দিতে রাজি নয়। সবার লক্ষ্য সেরা হওয়া। ফলে প্রস্তুতি ম্যাচেও খেলোয়াড়দের মধ্যে সংঘর্ষ দেখা গেছে, যা টুর্নামেন্টের আগেই উত্তাপ বাড়াচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন ফরম্যাটের কারণে এবারের বিশ্বকাপে আরও বেশি অপ্রত্যাশিত ফলাফল দেখা যেতে পারে এবং ছোট দলগুলোর সুযোগও বাড়বে।
বিশ্বকাপ ফুটবল এই বিশ্বায়নের যুগে মানুষের আবেগ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনীতির এক অনন্য মিলনমেলায় নতুন এক রূপ পরিগ্রহ করেছে। এই প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো যৌথভাবে এই মহাযজ্ঞের আয়োজন করছে। এই ত্রিমুখী আয়োজনকে প্রতীকীভাবে ধারণ করতেই বিশ্বকাপের অফিশিয়াল বলের নাম রাখা হয়েছে ট্রিওন্ডা, যার অর্থ তিনটি ঢেউ।
একটি বলের নামকরণ সাধারণত খুব বেশি আলোচনার বিষয় হয় না। কিন্তু ট্রিওন্ডা যেন কেবল একটি ফুটবল নয়। এটি তিনটি রাষ্ট্রের সম্মিলিত স্বপ্ন, তিনটি সংস্কৃতির সংলাপ এবং তিন ধরনের শক্তির প্রতীক।
তিন ঢেউয়ের প্রথমটি হলো শক্তির ঢেউ। বিশ্বকাপ আয়োজনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র আধুনিক অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সামর্থ্যের প্রতীক। বিশ্বের বৃহত্তম ক্রীড়া বাজারগুলোর একটি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত। বিশাল স্টেডিয়াম, উন্নত পরিবহনব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক সম্প্রচার-সুবিধা এবং বাণিজ্যিক স্পনসরশিপের বিশাল নেটওয়ার্ক দেশটিকে বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য একটি স্বাভাবিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে।
এই দিক থেকে ট্রিওন্ডার প্রথম ঢেউ যুক্তরাষ্ট্রের দিকে প্রবাহিত। এখানে ফুটবল কেবল খেলা নয়; এটি একটি অর্থনৈতিক পণ্যও। বিশ্বকাপকে ঘিরে পর্যটন, বিজ্ঞাপন, সম্প্রচার, প্রযুক্তি ও সেবাখাত থেকে যে বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হবে, তার বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে।
তিন ঢেউয়ের দ্বিতীয়টি হলো বৈচিত্র্যের ঢেউ। কানাডা বিশ্বকাপ আয়োজনের মাধ্যমে ভিন্ন এক বার্তা দিতে চায়। দেশটি পৃথিবীর অন্যতম বহুসাংস্কৃতিক রাষ্ট্র। বিভিন্ন জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ এখানে সহাবস্থান করে। ফলে কানাডার কাছে বিশ্বকাপ কেবল ক্রীড়া উৎসব নয়; এটি বৈচিত্র্যের উদযাপন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত অভিবাসীরা নিজেদের মাতৃভূমির দলের জন্য উল্লাস করবে, আবার একই সঙ্গে কানাডার নাগরিক হিসেবেও বিশ্বকাপের অংশ হবে। এই অনন্য বাস্তবতা বিশ্বকাপকে নতুন এক সামাজিক মাত্রা দিতে পারে। তিন ঢেউয়ের তৃতীয়টি হলো আবেগের ঢেউ। যদি ফুটবলের প্রতি নিখাদ ভালোবাসার কথা বলা হয়, তবে মেক্সিকো নিঃসন্দেহে তিন দেশের মধ্যে সবচেয়ে আবেগপ্রবণ প্রতিনিধি। মেক্সিকোর রাস্তাঘাট, শহর, গ্রাম সবখানেই ফুটবল মানুষের জীবনের অংশ। দেশটি অতীতে একাধিকবার বিশ্বকাপ আয়োজন করেছে এবং প্রতিবারই ফুটবল উৎসবকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
ফাইনালে যে দেশই জিতুক না কেন, ট্রিওন্ডার গন্তব্য হবে এক বৈশ্বিক মানবিক সংযোগে, যেখানে ফুটবল হবে ঐক্যের ভাষা এবং সাম্যের প্রতীক।
এই তিন ঢেউয়ের মূল কথা হলো তিন দেশের তিন শক্তি, এক বল। ট্রিওন্ডার নীল, লাল ও সবুজ রং তিন দেশের প্রতিনিধিত্ব করলেও বাস্তবে এগুলো তিন ধরনের শক্তিরও প্রতীক। নীল হলো প্রযুক্তি ও সক্ষমতার প্রতীক। লাল হলো বৈচিত্র্য ও সহাবস্থানের প্রতীক। সবুজ হলো আবেগ ও ঐতিহ্যের প্রতীক। এই তিন শক্তির সমন্বয়েই ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ গড়ে উঠবে। পৃথিবীর অন্য কোনো একক রাষ্ট্র হয়তো এত বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা একসঙ্গে দিতে পারত না।
বিশ্বকাপের এই ২৩তম আসরটি ১১ই জুন থেকে ১৯শে জুলাই পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুই দল এবং আটটি সেরা তৃতীয় স্থান অধিকারী দল নকআউট পর্যায়ে উঠবে। সেরা তৃতীয় স্থান নির্ধারণে পয়েন্ট, গোল পার্থক্য এবং মোট গোল এই তিনটি মানদন্ড প্রধান হিসেবে বিবেচিত হবে।
এবারের বিশ্বকাপ রেকর্ড সংখ্যক ৩৯ দিন ধরে চলবে, যা কাতারের ২৯ দিন এবং ২০১৪ ও ২০১৮ সালের আসরের ৩২ দিনের চেয়ে ১০ দিন বেশি। বৃহস্পতিবার, রাত ১টায় (বাংলাদেশ সময় ১২ জুন), মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজটেকা স্টেডিয়ামে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার ম্যাচ দিয়ে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।
উদ্বোধনী দিন থেকে ২৭শে জুন, শনিবার পর্যন্ত ১৭ দিনে মোট ৭২টি গ্রুপ পর্বের ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর অনুষ্ঠিত হবে ৩২ দলের পর্ব (২৮শে জুন-৩রা জুলাই), তারপরে ১৬ দলের পর্ব (৪ঠা-৭ই জুলাই), কোয়ার্টার-ফাইনাল (৯ই-১১ই জুলাই), সেমিফাইনাল (১৪ই-১৫ই জুলাই) এবং তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ (১৮ই জুলাই)।
আগামী ১৯শে জুলাই, রবিবার নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে নতুন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের হাতে কাপ তুলে দেওয়া হবে। যেহেতু ফিফা স্টেডিয়ামের জন্য আগে থেকে বিদ্যমান বাণিজ্যিক নাম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তাই ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য ভেন্যুগুলোর নামকরণ আয়োজক শহরের নামে করা হবে। মেক্সিকোতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়ামে, যেটি বিশ্বকাপের তিন সংস্করণ আয়োজনকারী প্রথম ভেন্যু হিসেবে ইতিহাস গড়বে।
এর পাশাপাশি ম্যাচ হবে গুয়াদালাহারা এবং মন্টেরেতেও। কানাডায় দুটি স্থানে খেলা হবে, টরন্টো এবং ভ্যাঙ্কুভারে। বিশ্বকাপের প্রধান আয়োজক হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেখানকার আটলান্টা, বোস্টন, ডালাস, হিউস্টন, কানসাস সিটি, লস অ্যাঞ্জেলেস, মিয়ামি, নিউ ইয়র্ক বা নিউজার্সি, ফিলাডেলফিয়া, সান ফ্রান্সিসকো বা সান্তা ক্লারা এবং সিয়াটলে খেলা হবে। যেহেতু ম্যাচগুলো চারটি ভিন্ন টাইম জোনে এবং ৪,৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্বে অবস্থিত ভেন্যুগুলোতে খেলা হবে, তাই মোট ১৩টি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ম্যাচ শুরু হবে।
আমেরিকাই হবে সেই মহাদেশ, যারা সবচেয়ে সহজে বিশ্বকাপ উপভোগ করতে পারবে, কারণ সব ম্যাচ নিজ নিজ ভেন্যুতে দুপুর ১টার আনুষ্ঠানিক বাঁশি বাজার পর থেকে মধ্যরাতে খেলা শেষ হওয়া পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে এবং ব্রাজিলের বেশিরভাগ অংশের ক্ষেত্রে, যদি তারা দিনের শেষ ম্যাচগুলো দেখতে চায়, তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের ভোর চারটার পরেও জেগে থাকতে হবে।
অন্যান্য মহাদেশের ক্ষেত্রে সময় ভিন্ন হবে। ইউরোপে বেশিরভাগ ম্যাচ সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরের দিন ভোর ৫টার মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে। পূর্ব এশিয়া ও ওশেনিয়ায় এগুলো মূলত ভোরবেলা দেখানো হবে।