রাজধানীতে নিরাপদ পানির তীব্র সংকট

সাইদুল ইসলাম

রাজধানী

মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনে নিরাপদ পানি পান করা অত্যাবশ্যক। কিন্তু রাজধানীসহ সারাদেশে নিরাপদ পানির সরবরাহ দিন দিন কমছে। বিশেষ করে রাজধানীতে

2026-06-09T11:04:07+00:00
2026-06-09T13:07:51+00:00
  শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬,
৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
 
শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
রাজধানী
রাজধানীতে নিরাপদ পানির তীব্র সংকট
মানবদেহের শতকরা ৭৫ ভাগ রোগের কারণ দূষিত পানি
সাইদুল ইসলাম
মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬, ১১:০৪ এএম  আপডেট: ০৯.০৬.২০২৬ ১:০৭ পিএম
ফাইল ছবি
মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনে নিরাপদ পানি পান করা অত্যাবশ্যক। কিন্তু রাজধানীসহ সারাদেশে নিরাপদ পানির সরবরাহ দিন দিন কমছে। বিশেষ করে রাজধানীতে নিরাপদ পানির সংকট তীব্রতর হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা এরজন্য নদী-খাল দূষণ, ভরাট এবং নদী তীরবর্তী এলাকা দখল করাকে দায়ী করেছেন। বর্তমাানে পানির চাহিদা মিটাতে ঢাকা ওয়াসা ভূ-উপরস্থ পানির উপর নির্ভরশীলতা বাড়াচ্ছে। কিন্তু সাধারন মানুষের চাহিদা বেশি ভূ-গর্ভস্থ পানি। তবে এর স্তর আশঙ্কাজনক হারে নেমে যাওয়ায় ভূ-গর্ভস্থ পানি পাওয়াও দুষ্কর হয়ে পড়ছে। রাজধানীর ক্রমবর্ধমান পানির চাহিদা পূরণ এবং ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে ও এর সংকট কাটাতে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বর্তমান সরকার। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবদেহের শতকরা ৭৫ ভাগ রোগের কারণ দূষিত পানি। বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা বিধান করা সম্ভব হলে মানুষ ৭৫ শতাংশ রোগ থেকে মুক্তি পাবে। এতে বিপুল অংকের চিকিৎসা ব্যয় থেকে রেহাই পেতে পারে মানুষ। পানির প্রাকৃতিক উৎসকে কেন্দ্র করেই বিশ্বের মানবসভ্যতাগুলো গড়ে উঠেছে। পানি যেখানে সহজপ্রাপ্য হয়েছে, সেখানেই জনবসতি গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। ইতিহাসবিদদের অনেকের ধারণা, পানির অভাব ও পানির দূষণ কিংবা বিশুদ্ধ পানির সংকটে অনেক সভ্যতা ও বসত বিলীন হয়ে গেছে। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য, স্বাচ্ছন্দ্য জীবনযাপনের জন্য নিরাপদ পানির বিকল্প নেই। এককালে পানির প্রাকৃতিক উৎসহসমূহ থেকে বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানির যোগান আসতো। এখন সে অবস্থা নেই। নানা কারণে পানির প্রাকৃতিক উৎসের সংখ্যা যেমন হ্রাস পাচ্ছে তেমনি অধিকাংশ ক্ষেত্রে পানির উৎসগুলো দূষণের শিকার হচ্ছে। ফলে কেবল আমাদের দেশেই নয়, বিশ্বজুড়েই বিশুদ্ধ পানির সংকট বৃদ্ধি পাচ্ছে। আশংকা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে বিশুদ্ধ পানির সংকট ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। ফলে বহু সভ্যতা ও বসতি গভীর অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে। ফলে দ্রুত এ সংকট সমাধানের বিকল্প নেই। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরাপদ পানি ব্যবহার ও পানের সুযোগ নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। তাদের জন্য সুপেয়, নিরাপদ ও ব্যবহারযোগ্য পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু ঢাকায় এই অধিকার এখন কাগজে-কলমে আছে কিন্তু বাস্তবে নেই। বছরের পর বছর অনিরাপদ পানি পান করছে রাজধানীর অধিকাংশ মানুষ। এমতাবস্থায় পানি নিরাপদ করতে সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। না হয় চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়বে নগরবাসী। এমতাবস্থায় এ সংকট কিছুটা কাটাতে রাজধানীতে যুক্ত হচ্ছে আরও ১০০ কোটি লিটার বিশুদ্ধ পানি। এরমধ্যে ‘ঢাকা এনভায়রনমেন্টালি সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই প্রকল্প’এর আওতায় নির্মাণাধীন গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগারের প্রথম ধাপ থেকে দৈনিক ৫০ কোটি লিটার এবং দ্বিতীয় ধাপ থেকেও সমপরিমাণ ৫০ কোটি লিটার পানি রাজধানীতে সরবরাহ করা হবে। দুই ধাপের কাজ সম্পন্ন হলে প্রকল্পটি থেকে প্রতিদিন মোট ১০০ কোটি লিটার বিশুদ্ধ পানি ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে। 

জানা গেছে, গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার চালু হলে রাজধানীর পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে এটি ঢাকা ওয়াসার ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে একটি পরিবেশসম্মত ও জলবায়ু-সহনশীল নগর পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এদিকে প্রচন্ড গরমসহ নানা কারণে রাজধানীতে শুরু হয়েছে পানির তীব্র সংকট। বিশেষ করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় ঢাকা ওয়াসার উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় ধস নেমেছে। জানা যায়, গ্রীষ্ম মৌসুমে ঢাকায় প্রতিদিন পানির চাহিদা ৩২৫ কোটি লিটারের বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ২৮০-২৯০ কোটি লিটার। অর্থাৎ দৈনিক ঘাটতি প্রায় ৪৫ কোটি লিটার। ফলে মিরপুর, উত্তরা, ভাটারা, শাহজাদপুর, কলাবাগানসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে পানির দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন এলাকার বাসিন্দারা। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সমস্যার সমাধানের আশ্বাসে তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। তবে এর জন্য ওয়াসার সাবেক এমডি তাকসিম এ খানকে দায়ী করেছেন ঢাকা ওয়াসার সংশ্লিষ্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, তাকসিম এ খান তার ইচ্ছেমতো ঢাকা ওয়াসাকে পরিচালনা করতে গিয়ে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি প্রায় ২০ শতাংশ সিস্টেম লস গোপনের কারণেই এখন নগরবাসীর অনেকে এর জন্য ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। এদিকে ঢাকায় কিছু এলাকায় পানির সংকটের পাশাপাশি পানিতে ময়লা ও দুর্গন্ধ রয়েছে বলে একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব এলাকার গ্রাহকরা বাড়ির পানির বিল পরিশোধ করার পরও ওয়াসার পাম্পস্টেশন থেকে পানি কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। সব মিলিয়েই ঢাকায় বিশুদ্ধ পানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কয়েকটি কারণে দিন দিন রাজধানীর পানি অনিরাপদ হয়ে উঠছে এবং ব্যবহারযোগ্য পানির সংকট বাড়ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, 
১. রাজধানীর অনেক এলাকার পানির লাইন ত্রুটিযুক্ত। কখনো কখনো পানির লাইন ও স্যুয়ারেজ একাকার হয়ে যায়। স্যুয়ারেজের ময়লা পানির লাইনে ঢুকে পড়াটা অনেকটা নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার। রাজধানীতে প্রতি পাঁচ জনে মাত্র একজন রীতিসম্মত স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার আওতায় আছেন। 

২. বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে পানির উৎস দূষিত হয়ে পড়ে। বিভিন্ন সময়ে দেখা যায় অনেক শৌচাগারের উপচে পড়া ময়লা ছড়িয়ে পানির উৎস দূষিত হয়ে পড়ে। 

৩. জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং অধিক সংখ্যায় মানুষ ঢাকামুখী হওয়ায় নিরাপদ পানির সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করেছে। 

৪. শিল্পবর্জ্য এবং পাতাল থেকে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে পানির গুণগত মানে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

৫. রাজধানী ঢাকায় ওয়াসার সরবরাহ করা পানি অনেক এলাকার মানুষ নিয়মিত পান না বলে প্রায় অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনাই প্রধানত দায়ী। 

৬. নিরাপদ পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দের ঘাটতি থাকে। বাজেট যা বরাদ্দ দেওয়া হয় তাও জনগণের কল্যাণে খরচ হয় কমই।

৭. পানি সমস্যার সমাধানে সঠিক লক্ষ্যমাত্রা ও করণীয় ঠিক করতে ব্যর্থতা রয়েছে। 

৮. ঢাকা ওয়াসায় জনগণের অংশীদারত্বের জন্য একটি বোর্ড রয়েছে। কিন্তু তেমন কার্যকর কোনো অংশীদারত্ব নেই।

৯. পানি ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বা যেসব সংস্থা উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত, জনগণের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা কম। ফলে এসব সমস্যা সমাধান করলে অনেকটাই নিরাপদ হতে পারে পানি। এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

গতকাল সোমবার ঢাকা ওয়াসার বাস্তবায়নাধীন ‘ঢাকা এনভায়রনমেন্টালি সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই প্রকল্প’-এর আওতায় নির্মাণাধীন গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্লান্ট পরিদর্শনকালে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দ্রুত নগরায়ণের ফলে রাজধানীতে নিরাপদ পানির চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি। 

নগরবাসীর সুস্বাস্থ্য, পরিবেশ সুরক্ষা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ মানের সেবা প্রদানে সংশ্লিষ্টদের পেশাদারত্ব, দক্ষতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে মন্ত্রী রাজধানীর পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, দেশের পানিসম্পদের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নদী ও অন্যান্য উৎস থেকে সংগ্রহ করা ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পানিসম্পদ সংরক্ষণ সহজ হবে।


Loading...
Loading...

রাজধানী- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: