বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়তে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক বৃষ্টি ও রোদের পালাবদলে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকায় এডিস মশার বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মূলত সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও বিশেষ অভিযান পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে ৯ জুন পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৮৪৪ জন। শুধু জুন মাসের প্রথম ১০ দিনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৪৭ জন রোগী। একই সময়ে ডেঙ্গুতে একজনের মৃত্যু হওয়ায় এ বছর মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয়জনে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ঈদ-পরবর্তী সময়ে এবং সাম্প্রতিক টানা বৃষ্টির কারণে মশার উপদ্রব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, দিনের তুলনায় সন্ধ্যার পর মশার উৎপাত অসহনীয় হয়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষা মৌসুম এডিস মশার বংশবিস্তারের সবচেয়ে উপযোগী সময়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে জমে থাকা পানির উৎসগুলো যথাযথভাবে তদারকি করা হয়নি। এর সঙ্গে বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পাওয়ায় এডিস মশার প্রজননও বেড়েছে। ফলে ঈদের আগের সময়ের তুলনায় বর্তমানে ডেঙ্গুর ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরও বলেন, শুধু পূর্ণবয়স্ক মশা নিধনে ব্যবহৃত কীটনাশকের ওপর নির্ভর না করে লার্ভা ধ্বংস এবং মশা নিয়ন্ত্রণের কৌশলে পরিবর্তন আনতে হবে। অন্যথায় আগামী দিনে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা আরও দ্রুত বাড়তে পারে।
এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, চলতি বছর ডেঙ্গু মোকাবিলা সহজ হবে না। এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ জরিমানা করারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতে এডিস মশার ঘনত্ব নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি। এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় বিশেষ ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ পরিচালনা করছে সংস্থাটি।
ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান জানান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ অভিযান চলছে। পাশাপাশি স্কুল-কলেজভিত্তিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি, বাসাবাড়িতে জমে থাকা পানি অপসারণ এবং মশকনিধন কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হবে।
অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও ওয়ার্ডভিত্তিক মশকনিধন, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, সভা-সেমিনার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী তিন মাসব্যাপী এসব কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে চলবে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে দেশব্যাপী তিন মাসের বিশেষ অভিযান শুরু করেছে। তবে নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, কেবল ফগিং বা রাসায়নিক ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করলে দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাওয়া যাবে না।
নগর-পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং জৈবিক ব্যবস্থাপনার সমন্বিত প্রয়োগ জরুরি। অন্যথায় প্রতিবছরই ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিকদের সচেতন অংশগ্রহণই ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। জমে থাকা পরিষ্কার পানি নিয়মিত অপসারণ এবং আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখার মাধ্যমে এডিস মশার বিস্তার অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব।