লালপুর উপজেলার একমাত্র সরকারি ফুটবল মাঠ বিলমাড়ীয়া মাঠকে ঘিরে আবারও জেগে উঠেছে নতুন স্বপ্ন। একসময় উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রাণবন্ত ক্রীড়াঙ্গন হিসেবে পরিচিত এই মাঠটি বর্তমানে অবহেলা ও অযত্নে অনেকটাই জৌলুস হারালেও, আধুনিক মিনি স্টেডিয়ামে রূপান্তরের সম্ভাবনায় আশাবাদী হয়ে উঠেছেন স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমী, খেলোয়াড় ও এলাকাবাসী।
ব্রিটিশ আমলের ইতিহাস বহনকারী বিলমাড়ীয়া ফুটবল মাঠ একসময় বিভিন্ন টুর্নামেন্ট, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও সামাজিক আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। প্রবীণদের ভাষ্যমতে, ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই মাঠটিতে নিয়মিত ফুটবল খেলার আয়োজন হতো। নব্বইয়ের দশকেও দেশের খ্যাতনামা ফুটবলারদের পদচারণায় মুখর থাকত এই মাঠ। দূর-দূরান্ত থেকে দর্শকরা ছুটে আসতেন খেলা উপভোগ করতে।
কালের পরিক্রমায় সেই গৌরবময় অধ্যায় অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। বর্তমানে মাঠটির অবকাঠামোগত অবস্থা নাজুক। মাঠের সমতলতা নষ্ট হয়ে গেছে, বর্ষা মৌসুমে পানি জমে দীর্ঘ সময় খেলার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। নেই পর্যাপ্ত দর্শক গ্যালারি, আধুনিক ড্রেসিং রুম কিংবা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ফলে স্থানীয় ক্রীড়াচর্চা ব্যাহত হচ্ছে।
মাঠটির উন্নয়নে প্রথম বড় উদ্যোগ নেওয়া হয় সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মরহুম ফজলুর রহমান পটলের সময়। তাঁর উদ্যোগে মাঠের সীমানাপ্রাচীর ও দুটি গেট নির্মাণকাজ শুরু হলেও বিভিন্ন কারণে তা অসমাপ্ত থেকে যায়। দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটির কাজ বন্ধ থাকায় হতাশ হয়ে পড়েছিলেন এলাকাবাসী।
সম্প্রতি সেই স্থবিরতায় নতুন গতি এসেছে। মরহুম ফজলুর রহমান পটলের অসমাপ্ত স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুলের কাছে মাঠ সংস্কার ও মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণের দাবি জানানো হলে তিনি সরেজমিনে মাঠ পরিদর্শন করেন। এ সময় বিলমাড়ীয়া ফুটবল ফেডারেশনের উদ্যোগে নির্মাণাধীন ড্রেসিং রুমের কাজ সম্পন্ন করার জন্য ব্যক্তিগতভাবে এক লাখ টাকা অনুদান প্রদান করেন।
পরিদর্শনকালে তিনি এলাকাবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নের রূপকার মরহুম ফজলুর রহমান পটলের অসমাপ্ত স্বপ্ন বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বিলমাড়ীয়া সরকারি ফুটবল মাঠ সংস্কার করা হবে এবং এটিকে আধুনিক ‘ডিজিটাল মিনি স্টেডিয়াম’-এ রূপান্তর করা হবে।
স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমীদের মতে, একটি মানসম্মত খেলার মাঠ শুধু ক্রীড়া উন্নয়নের জন্য নয়, সামাজিক উন্নয়নেরও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাদের ভাষায়, তরুণদের মাদক, সন্ত্রাস ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলার বিকল্প নেই। কিন্তু পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে অনেক তরুণ মাঠমুখী হতে পারছে না।
লালপুর উপজেলার বিভিন্ন ক্রীড়া সংগঠকের অভিমত, বিলমাড়ীয়া মাঠ আধুনিকায়ন করা গেলে এখানে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন সম্ভব হবে। এতে স্থানীয় প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা নিজেদের দক্ষতা বিকাশের সুযোগ পাবে এবং এলাকায় ক্রীড়া সংস্কৃতির নতুন জাগরণ সৃষ্টি হবে।
স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও মাঠ সংস্কারের বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার কথা জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দ্রুত উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে।
একসময় যে মাঠ হাজারো দর্শকের উল্লাসে মুখর থাকত, সেই বিলমাড়ীয়া ফুটবল মাঠকে ঘিরেই এখন নতুন প্রত্যাশা। এলাকাবাসীর বিশ্বাস, সরকারি উদ্যোগ ও জনপ্রতিনিধিদের আন্তরিক সহযোগিতায় মাঠটি আবারও তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে। আধুনিক মিনি স্টেডিয়ামে রূপান্তরিত হলে এটি শুধু লালপুর নয়, সমগ্র নাটোর অঞ্চলের ক্রীড়া উন্নয়নের নতুন ঠিকানা হয়ে উঠতে পারে।